ব্লগ

১০% এর আতঙ্ক

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ফোনের স্ক্রিনে লাল রংটা দেখার সাথে সাথে আমার বুকের ভিতর যেন একটা তার ছিঁড়ে গেল। ১০%। শুধু দুটো সংখ্যা, অথচ এত ভয় লাগছে কেন?

আরাশ বারান্দায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর কৌতূহলী চোখ দুটো কি জানে যে ওর বাবার হাতে থাকা এই ছোট্ট যন্ত্রটাই এখন ওর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? আমি চার্জার খুঁজতে গিয়ে ড্রয়ারের সব কিছু এলোমেলো করে ফেলি। হাত কাঁপছে। এটা কেমন অসুস্থতা?

মনে পড়ে, ছোটবেলায় বাবা বলতেন – “মানুষের প্রয়োজন খুব কম। খাবার, বাসস্থান, আর শান্তি।” তাহলে এই কালো প্লাস্টিকের টুকরোটা কখন আমার প্রয়োজনের তালিকায় সবার উপরে চলে এল? কখন আমি এত নির্ভরশীল হয়ে গেলাম?

৯%। আরো কমে গেল। আমার মনে হচ্ছে যেন আমার নিজের প্রাণশক্তি কমে যাচ্ছে। হ্যাপি রান্নাঘরে কাজ করছে, আমার এই অবস্থা দেখলে হাসবে নিশ্চয়ই। “ওরে হায়দার, ফোন বন্ধ হয়ে গেলেই তো দুনিয়া শেষ হবে না!” – এই কথাটা ও অনেকবার বলেছে।

কিন্তু আমি জানি, এটা শুধু ফোনের চার্জের ব্যাপার নয়। এটা আমার সংযোগ বিছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয়। কাজের ফোন আসতে পারে। বন্ধুরা কিছু জরুরি বলতে পারে। আর যদি কোনো বিপদে পড়ি? যদি হারিয়ে যাই? যদি…

৮%। এবার ফোনটা কম্পিত হল। যেন বিদায়ের আগে একবার জানান দিল।

হঠাত মনে হল, আমি কি সেই আদিম মানুষটার মতো হয়ে গেছি, যে আগুন নিভে যাওয়ার ভয়ে সারারাত জেগে থাকত? তফাতটা শুধু এই যে, আজকে আগুনটা হচ্ছে ব্যাটারির ভোল্টেজ।

চার্জার পেয়ে গেলাম। হাতে নিয়ে যেন জীবন ফিরে পেলাম। প্লাগ লাগাতেই ফোনে চার্জিং সাইনটা দেখে আমার শ্বাস স্বাভাবিক হল। ১১%, ১২%, ১৩%… প্রতিটা পারসেন্ট বাড়ার সাথে সাথে আমার উদ্বেগ কমছে।

আরাশের দিকে তাকালাম। ও এখনো বারান্দায়, রাস্তার মানুষদের দেখছে। ওর কাছে এই মুহূর্তেই বারান্দার রেলিং, আকাশের মেঘ, রাস্তার গাছটা – সবকিছুই সত্যি। আমার কাছে সত্যিটা হচ্ছে এই পকেটের যন্ত্র।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই গেল – আমি কি যন্ত্রটাকে চালাচ্ছি, নাকি যন্ত্রটা আমাকে?

২০%। এখন নিরাপদ। আমি আবার মানুষ।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *