“আর ৫ মিনিট।” মুখ থেকে এই কথাটা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই জানি যে এটা মিথ্যা। কিন্তু তবুও বলি। হ্যাপি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়ে আছে, আমি এখনো বিছানায়। সে বলছে, “দেরি হয়ে যাবে।” আমি বলছি, “আর ৫ মিনিট।”
এই ৫ মিনিট কখনো ৫ মিনিট থাকে না। এটা হয়ে যায় ১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট, কখনো কখনো ১ ঘন্টা। যেন আমার ভিতর একটা ভাঙা ঘড়ি আছে যেটা সময়ের হিসেব রাখতে পারে না।
কেন এমন হয় আমার সাথে? কেন আমি সময়ের সঠিক পরিমাপ করতে পারি না? ৫ মিনিট মানে ৩০০ সেকেন্ড। এত সহজ একটা হিসেব। কিন্তু আমার মনের ভিতরে ৫ মিনিট একটা অসীম সংখ্যা হয়ে যায়।
হ্যাপি অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে যায়। আরাশ বলে, “আব্বু, আপনার ৫ মিনিট আর আমাদের ৫ মিনিট এক না।” এগারো বছরের একটা ছেলে আমার চরিত্রের এই দুর্বলতা ধরে ফেলেছে।
অফিসেও এমনই। বস বলেন, “কাজটা কখন হবে?” আমি বলি, “আর ৫ মিনিট।” কিন্তু ৫ মিনিটে তো শুধু ইমেইল চেক করা হয়। তারপর আরেকটা কাজের জন্য আরো ৫ মিনিট। এভাবে দিন শেষ হয়ে যায়।
এই অভ্যাসটা কোথা থেকে এসেছে? ছোটবেলায় মা বলতেন, “উঠ, স্কুলে যেতে হবে।” আমি বলতাম, “আর ৫ মিনিট।” তখন থেকেই এই ফাঁদে পড়েছি। ৫ মিনিট একটা নিরাপদ সময় মনে হয়। না বেশি, না কম।
কিন্তু আসলে কি আমি সময় সম্পর্কে ধারণাই রাখি না? নাকি আমি জেনেবুঝে মিথ্যা বলি? মনের একটা অংশ জানে যে ৫ মিনিটে কাজ হবে না, কিন্তু মুখ বলে ফেলে অভ্যাসের বশে।
আরাশের স্কুলে যেতে দেরি হলে সে বলে, “আব্বু, আপনার জন্য আমার দেরি হল।” তার এই কথায় অপরাধবোধ হয়। আমার এই অভ্যাসের জন্য অন্যরা কষ্ট পায়।
একবার হিসেব করে দেখেছি, আমার এই “৫ মিনিট” অভ্যাসের জন্য মাসে কত সময় নষ্ট হয়। অন্তত ১০ ঘন্টা। এই ১০ ঘন্টায় কত কাজ করা যেত!
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “সময়ের এত অসম্মান কেন করি? সময় তো আল্লাহর দেওয়া আমানত।” মনে হয় যেন উত্তর আসছে – “তুমি নিজেকেই ঠকাচ্ছ।”
হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি যদি বল ১০ মিনিট, তাহলে আমি বুঝব ৩০ মিনিট।” তার এই কথায় বুঝলাম আমার বিশ্বসনীয়তা কতটা কমে গেছে।
কিন্তু কেন পারি না সঠিক সময় বলতে? কেন এই আত্মপ্রতারণা? হয়তো আমি আসলে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। “৫ মিনিট” বলে মনে করি আমি সময়ের মালিক।
রাতে শুয়ে ঠিক করি, আগামীকাল থেকে সঠিক সময় বলব। কিন্তু সকালে হ্যাপি বলতেই আবার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, “আর ৫ মিনিট।”
এই অভ্যাস ছাড়তে পারব কিনা জানি না। কিন্তু অন্তত এখন জানি যে এটা একটা সমস্যা। আর সমস্যা চেনাটাই তো সমাধানের প্রথম ধাপ।
হয়তো একদিন আমি সত্যিকারের ৫ মিনিটেই কাজ সেরে ফেলব। সেদিন আমার পরিবার অবাক হয়ে যাবে। কিন্তু সেদিন পর্যন্ত এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে – নিজের সাথেই।
একটু ভাবনা রেখে যান