ব্লগ

আদালতে সাক্ষী

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ঢাকা জেলা আদালত
মামলা নং: ১২৩৪/২০২৪
বিষয়: সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা


বিচারক: আপনার নাম বলুন।

সাক্ষী: আমার নাম বলার দরকার নেই, হুজুর। আমি একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু সাধারণ মানুষের অসাধারণ কষ্টের গল্প বলতে এসেছি।

বিচারক: আপনি কী দেখেছেন?

সাক্ষী: দেখেছি, হুজুর। চোখে দেখেছি। কীভাবে মানুষ মানুষকে ছোট করে। কীভাবে জন্মের কারণে কেউ উঁচু, কেউ নিচু।

বিচারক: নির্দিষ্ট কোন ঘটনার কথা বলুন।

সাক্ষী: ঘটনা? একটা নয়, হাজারটা। প্রতিদিনের ঘটনা।

গত সপ্তাহে দেখলাম। একটা ছেলে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেছে। যোগ্যতা আছে। ডিগ্রি আছে। কিন্তু ফিরে এল কাঁদতে কাঁদতে।

বিচারক: কেন?

সাক্ষী: তার নাম শুনেই বলে দিয়েছে, “আপনাদের জন্য আলাদা কোটা আছে। এখানে সরাসরি নেওয়া হয় না।”

নাম শুনেই! যোগ্যতা দেখার আগেই!

বিচারক: আরো কিছু?

সাক্ষী: আরো? হুজুর, তালিকা দিব?

দেখেছি একটা মেয়ে। চাকরি পেয়েছে। কিন্তু অফিসে তার জন্য আলাদা গ্লাস। আলাদা চেয়ার। কেন? কারণ তার জাত ভিন্ন।

দেখেছি একটা মানুষ। পড়াশোনা জানে। কিন্তু তার বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি নেবে না। কেন? বলে, “আমাদের স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড আছে।”

স্ট্যান্ডার্ড মানে কী? টাকা? না জাত?

বিচারক: এসব তো সমাজে চলে আসছে। নতুন কী?

সাক্ষী: হুজুর, চুরি-ডাকাতিও চলে আসছে। তাই বলে আইন নেই?

বৈষম্যও অপরাধ। মানুষের সাথে মানুষের মতো আচরণ না করা অপরাধ।

বিচারক: আপনি কী চান?

সাক্ষী: চাই ন্যায়বিচার। চাই সমতা।

চাই যে ছেলেটা যোগ্য, সে চাকরি পাক। তার নাম যাই হোক।

চাই যে মেয়েটা পড়তে পারে, সে স্কুলে যাক। তার বাবার পেশা যাই হোক।

চাই যে মানুষটা সৎ, তার সম্মান হোক। তার জন্ম যেখানেই হোক।

বিচারক: কিন্তু সমাজ পরিবর্তন সহজ তো নয়।

সাক্ষী: সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়।

আমি দেখেছি, একটা কোম্পানিতে মেধার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হয়। নাম-ধর্ম-জাত দেখা হয় না। সেখানে সব ধরনের মানুষ কাজ করে। একসাথে খায়। একসাথে হাসে।

দেখেছি, একটা স্কুলে সব শ্রেণীর বাচ্চারা পড়ে। গরিব-ধনী, উঁচু-নিচু সব। কেউ কাউকে ছোট মনে করে না।

তাহলে পুরো সমাজে কেন সম্ভব নয়?

বিচারক: আপনার কি কোন প্রস্তাব আছে?

সাক্ষী: আছে, হুজুর।

প্রথম: কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শাস্তি। জাত-ধর্ম দেখে চাকরি না দিলে জরিমানা।

দ্বিতীয়: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবার সমান সুযোগ। ভর্তিতে শুধু মেধা, অন্য কিছু নয়।

তৃতীয়: সরকারি সেবায় সবার সমান অধিকার। থানা-আদালত-হাসপাতালে কারো বৈষম্য নয়।

চতুর্থ: গণমাধ্যমে সচেতনতা। বৈষম্য যে অন্যায়, সেটা শেখানো।

বিচারক: এসব করতে তো সময় লাগবে।

সাক্ষী: সময় লাগবে। কিন্তু শুরু করতে হবে আজ থেকেই।

আমি নিজে শুরু করেছি। বাসায় কাজের মেয়েটাকে একই টেবিলে খেতে দিই। তার মেয়েকে আমার ছেলের সাথে পড়তে বসাই।

আমার বন্ধুরা অবাক হয়। বলে, “এসব কী করছো?”

বলি, “মানুষত্ব শেখাচ্ছি।”

বিচারক: আপনি কি মনে করেন এই লড়াই জেতা যাবে?

সাক্ষী: হুজুর, লড়াই ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

দেখেন, একসময় মেয়েরা পড়তে পারত না। এখন পারে।

একসময় নিম্নবর্ণের মানুষ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত না। এখন পারে।

একসময় গরিবের ছেলে বিচারক হতে পারত না। আজ এই আদালতেই আছে।

তাহলে পরিবর্তন হয় না?

বিচারক: আপনার শেষ কথা?

সাক্ষী: হুজুর, আমি চাই আমার নাতি-নাতনিরা এমন একটা পৃথিবী পাক, যেখানে মানুষ মানুষের জন্ম নিয়ে প্রশ্ন করবে না। করবে কাজ নিয়ে।

যেখানে কেউ ছোট হবে না জাতের কারণে। ছোট হবে কাজের কারণে।

যেখানে সম্মান মিলবে মেধা দিয়ে। পদবি দিয়ে নয়।

এই স্বপ্নের জন্য লড়ব। মরা পর্যন্ত লড়ব।

বিচারক: ধন্যবাদ। আপনার সাক্ষ্য রেকর্ড করা হলো।

সাক্ষী: ধন্যবাদ, হুজুর। ন্যায়বিচারের জন্য।


আদালত উঠেছে। সত্যের জয় হোক।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

কথা

স্যার

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *