আজ সকালে ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখলাম। “ফতোয়া – মহিলাদের জন্য পোষাক রঙিন হওয়া হারাম।” নিচে লেখা – “আল্লামা হুজুর ফতোয়া বিভাগ।” কমেন্টে একজন লিখেছেন, “কিন্তু আয়েশা (রা:) তো রঙিন কাপড় পরতেন।” জবাবে এসেছে – “আপনি হুজুর সাহেবের চেয়ে বেশি জানেন?”
আমি হ্যাপিকে পোস্টটা দেখাই। সে বলে, “এইটা কি সত্যি?” আমি বলি, “আমি তো এরকম কিছু কোরআন-হাদিসে পাইনি।” হ্যাপি বলে, “তাহলে হুজুর কেন এরকম বলেন?”
আমি উত্তর দিতে পারি না।
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আজ স্কুলে আমাদের ক্লাসমেট রুবার আম্মু ওকে নিয়ে আসেননি। কারণ হুজুর বলেছেন মেয়েদের স্কুলে পড়া গুনাহ।” আমি চমকে উঠি। “কোন হুজুর?” আরাশ বলে, “ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখে রুবার আব্বু।”
আমি ইউটিউব খুলে সার্চ করি। দেখি সেই ভিডিও। হুজুর সাহেব বলছেন, “মেয়েদের শিক্ষা ফিতনার কারণ।” আমি কমেন্ট পড়ি। একজন লিখেছে, “আয়েশা (রা:) কি শিক্ষিত ছিলেন না? তিনি কি হাদিস শেখাতেন না?”
এই কমেন্টের কোনো জবাব নেই।
আমি আরেকটা ভিডিও দেখি। অন্য হুজুর বলছেন, “গান শোনা কবিরা গুনাহ।” তার ব্যাকগ্রাউন্ডে কিন্তু নাশিদ বাজছে। আমি ভাবি – নাশিদ কি গান না?
হ্যাপি বলে, “এতো বিধি-নিষেধ দিয়ে ইসলাম কি এত কঠিন?” আমি বলি, “আমার মনে হয় না। নবীজি (সা:) তো বলেছেন দ্বীন সহজ।”
আমি গুগলে সার্চ করি – “ফতোয়া কী?” দেখি ফতোয়া মানে ধর্মীয় মতামত। কিন্তু এখন এটা ঐশী আদেশের মতো চালানো হচ্ছে।
আমি আরো সার্চ করি। দেখি একই বিষয়ে ১০ জন আলেমের ১০ রকম ফতোয়া। কেউ বলেন হারাম, কেউ বলেন হালাল, কেউ বলেন মাকরুহ। আমি ভাবি – আল্লাহর হুকুম কি এত পরিবর্তনশীল?
একদিন আমাদের এলাকার হুজুর সাহেবের সাথে দেখা। তিনি বলেন, “হায়দার ভাই, আপনার স্ত্রী কাজ করেন কেন? এটা তো ইসলাম সমর্থন করে না।” আমি বলি, “হুজুর, খাদিজা (রা:) কি ব্যবসা করতেন না?” তিনি বলেন, “সেই যুগ ছিল আলাদা।”
আমি বলি, “কিন্তু ইসলামের মূল নীতি কি যুগে যুগে বদলায়?”
তিনি রাগ করে চলে যান।
রাতে আমি কোরআন পড়ি। দেখি আল্লাহ বলেছেন – “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।” কিন্তু আমাদের চারপাশে এত জোরজবরদস্তি কেন?
আমি একটা লিস্ট বানাই। গত এক মাসে যত ফতোয়া শুনেছি:
- ফুটবল দেখা হারাম
- ফটো তোলা হারাম
- জন্মদিন পালন হারাম
- গায়ে সাবান ব্যবহার হারাম (কারণ সুগন্ধি থাকে)
- হাসি-ঠাট্টা হারাম
আমি ভাবি – এইভাবে হারাম করতে থাকলে তো শুধু নিঃশ্বাস নেয়া হালাল থাকবে।
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আমার বন্ধু সাকিবের আব্বু বলেছেন ইংরেজি পড়া হারাম। কারণ এটা কাফেরদের ভাষা।” আমি বলি, “কিন্তু আরবিও তো অমুসলিমরা বলে। তাহলে আরবিও হারাম হয়ে যায়?”
আরাশ বলে, “আমিও তাই ভাবি।”
আমি ইউটিউবে “ভুল ফতোয়া” লিখে সার্চ করি। দেখি একজন স্কলার বলছেন, “অনেক ফতোয়া আসলে ব্যক্তিগত মতামত। কোরআন-হাদিসের রেফারেন্স নেই।” আমি মনে করি – তাহলে মানুষ কেন মানে?
আমার মনে পড়ে একটা ঘটনা। এক হুজুর বলেছিলেন ব্যাংকিং হারাম। তার পরের সপ্তাহেই দেখি তিনি ATM থেকে টাকা তুলছেন।
আমি হ্যাপিকে বলি, “মনে হচ্ছে অনেক হুজুর নিজেদের মতামত আল্লাহর নাম দিয়ে বলেন।” হ্যাপি বলে, “তাহলে কীভাবে বুঝবো কোনটা সঠিক?”
আমি বলি, “কোরআন-হাদিস নিজে পড়তে হবে। অন্ধভাবে মানা যাবে না।”
কিন্তু মনে মনে ভাবি – সাধারণ মানুষের তো সময় নেই এতকিছু গবেষণা করার। তারা ভাবে হুজুর যা বলেন তাই সত্য।
আমি একটা প্রশ্ন করি নিজেকে – ধর্মীয় নেতৃত্ব কি একটা পাওয়ার পলিটিক্স হয়ে গেছে? যেখানে ফতোয়ার নামে নিয়ন্ত্রণ করা হয়?
রাতে স্বপ্ন দেখি। আমি কেয়ামতের দিন। আল্লাহ প্রশ্ন করছেন, “তুমি কেন আমার নামে ভুল কথা বলেছো?” আমি বলি, “আমি তো বলিনি, হুজুর বলেছেন।” আল্লাহ বলেন, “তুমি কি আমার কিতাব পড়োনি? তুমি কি যাচাই করোনি?”
আমি কোনো জবাব দিতে পারি না।
সকালে ঘুম ভেঙে আয়নায় মুখ দেখি। মনে হয় আমি একটা জটিল খেলার মধ্যে আছি। যেখানে কিছু মানুষ আল্লাহর নামে নিজেদের মতামত চালিয়ে দিচ্ছে।
আর আমার মতো সাধারণ মানুষ কনফিউজড হয়ে আছি – কোনটা আল্লাহর হুকুম, কোনটা মানুষের বানানো?
একটু ভাবনা রেখে যান