ব্লগ

একই বৃত্তে

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল আবার সেই একই ভুল করলাম। রেগে গিয়ে হ্যাপির সাথে কথা বলেছি। সে চাকরি নিয়ে একটা পরামর্শ দিয়েছিল। আমি ভেবেছি সে আমার যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে।

পরে বুঝলাম—সে শুধু সাহায্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে। আমাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

এটা কতবার হয়েছে? কতবার আমি একই ভুল করেছি? অহংকার আর হীনমন্যতার মিশ্রণে এমন আচরণ যা পরে অনুশোচনা এনে দেয়।

আমি ভাবলাম—কেন আমি বারবার একই ভুল করি? আমি তো জানি এটা ভুল। আমি তো অনুভব করেছি এর পরিণতি। তাহলে কেন থামতে পারি না?

আরাশ এসে বলল, “বাবা, তুমি আর আম্মু রাগারাগি করেছো?” শিশুদের এই সংবেদনশীলতা দেখে আমার আরো খারাপ লাগল।

“না বাবা, আমরা রাগারাগি করিনি। একটু মতবিরোধ হয়েছে।”

“কেন হয়? তোমরা তো ভালোবাসো।”

আরাশের এই সরল প্রশ্নে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। হ্যাঁ, আমরা ভালোবাসি। তাহলে কেন এই পুনরাবৃত্তি?

আমার মনে পড়ল বাবার কথা। বাবাও এরকম করতেন। রেগে যেতেন হঠাৎ। পরে অনুশোচনা করতেন। মা চুপ হয়ে যেতেন। আমি ছোটবেলায় ভাবতাম—আমি বড় হলে এরকম করবো না।

কিন্তু আজ দেখছি—আমি সেই একই কাজ করছি। বাবার মতোই। যেন আমার মধ্যে তার জিন কাজ করছে।

এটা কি অবধারিত? আমরা কি আমাদের বাবা-মায়ের ভুলগুলো বহন করতে বাধ্য?

সন্ধ্যায় হ্যাপির কাছে ক্ষমা চাইলাম। “আমি ভুল করেছি। রাগ করার কোনো কারণ ছিল না।”

হ্যাপি বলল, “তুমি সবসময় এটা বলো। কিন্তু আবার করো।”

তার কথায় আমি হতাশ হয়ে গেলাম। সত্যি কথা। আমি বারবার ক্ষমা চাই। বারবার প্রতিশ্রুতি দিই। কিন্তু পরিবর্তন হয় না।

“আমি চেষ্টা করছি,” আমি বললাম।

“কিন্তু যথেষ্ট নয়,” হ্যাপি বলল। “তুমি জানো কী ভুল। কিন্তু বুঝতে পারছো না কেন করো।”

হ্যাপি ঠিক বলেছে। আমি জানি আমার সমস্যা কী। কিন্তু সমাধান জানি না।

রাতে একা বসে ভাবলাম—আমার এই রাগের পেছনে কী আছে? কেন আমি হ্যাপির কথায় আহত বোধ করি?

হয়তো কারণ আমি নিজের উপর আস্থা হারিয়েছি। চাকরি হারানোর পর আমার আত্মবিশ্বাস কমে গেছে। তাই যখন কেউ কিছু বলে, মনে হয় সে আমার দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করছে।

কিন্তু এই উপলব্ধি থাকলেও আমি পরিবর্তন করতে পারছি না কেন?

আমার মনে পড়ল একটা বই পড়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল—মানুষ একই ভুল বারবার করে কারণ ভুল করাটা পরিচিত। পরিবর্তন করাটা অজানা।

আমাদের মস্তিষ্ক পরিচিত প্যাটার্নে চলে। যদিও সেই প্যাটার্ন ক্ষতিকর, কিন্তু সেটা জানা। নতুন প্যাটার্ন অজানা, তাই ভয়ের।

তাহলে আমি কি এই ভয়ের বন্দী?

পরদিন সকালে আরাশকে স্কুলে দিয়ে আসার সময় লক্ষ করলাম—সেও তার কিছু অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি করে। হোমওয়ার্ক শেষ মুহূর্তে করে। বারবার বলার পরেও।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি জানো তোমার হোমওয়ার্ক আগে করা উচিত। তাহলে কেন শেষ মুহূর্তে করো?”

আরাশ ভেবে বলল, “জানি না। মনে হয় সময় আছে। তারপর হঠাৎ দেখি শেষ হয়ে গেছে।”

আমি বুঝলাম—এটা আমার সমস্যারই ছোট সংস্করণ। আমিও মনে করি আমার কাছে সময় আছে পরিবর্তনের জন্য। তারপর হঠাৎ দেখি আবার সেই একই ভুল করেছি।

সেদিন রাতে নিজের সাথে একটা চুক্তি করলাম। আমি ছোট ছোট পরিবর্তন করার চেষ্টা করবো। যখন হ্যাপি কিছু বলবে, আমি প্রথমে তিন সেকেন্ড চুপ থাকবো। এই তিন সেকেন্ডে ভাববো—সে কি আমাকে আক্রমণ করছে, নাকি সাহায্য করতে চাইছে?

প্রথম কয়েকদিন কঠিন ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন আনতে পারলাম।

একদিন হ্যাপি বলল, “তুমি আলাদা লাগছো।”

“কেমন আলাদা?”

“কম রাগ করছো। বেশি শুনছো।”

আমি খুশি হলাম। ছোট পরিবর্তন, কিন্তু পরিবর্তন।

আমি বুঝলাম—জীবনের পুনরাবৃত্তি ভাঙা যায়। কিন্তু সেটা একদিনে হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতনতার মাধ্যমে হয়।

আর সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের স্বীকার করতে হয় যে আমরা একা এই লড়াই করতে পারি না। আমাদের সাহায্য লাগে। পরিবারের। বন্ধুদের। এমনকি নিজের কাছ থেকেও।

কারণ পুনরাবৃত্তি ভাঙতে চাইলে প্রথমে নিজেকে ক্ষমা করতে হয়। তারপর পরিবর্তনের জন্য ধৈর্য রাখতে হয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *