“আরেকটু খাও।” এই তিনটি শব্দ শুনলেই মনে পড়ে যায় মায়ের মুখ। যদিও মা এখন আর নেই, কিন্তু তার এই কণ্ঠস্বর আজও কানে বাজে। আরাশকে খাওয়ানোর সময় হ্যাপি যখন একই কথা বলে, তখন মনে হয় যেন সময় পিছিয়ে গেল।
ছোটবেলায় এই কথাটা শুনে বিরক্ত লাগত। মনে হত মা কেন জোর করে খাওয়াতে চায়। পেট তো ভরে গেছে। আর কতটুকু খেতে পারি? কিন্তু মা থামতেন না। “আরেকটু। শুধু আরেকটু।”
এখন যখন আরাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, তখন মনে হয় সে যথেষ্ট খায়নি। মনে হয় আরো খেলে ভালো হয়। তখনই বুঝি মায়ের মনের অবস্থাটা।
হ্যাপি আরাশকে বলছে, “আরেকটু নে।” আরাশ বলছে, “আর পারছি না।” আমি পাশে বসে দেখছি এই একই দৃশ্য যেটা ত্রিশ বছর আগে আমার সাথে ঘটেছিল। কিন্তু এবার আমি আরাশের পক্ষ নিচ্ছি না। নিজেকে অবাক লাগছে।
মায়েদের এই “আরেকটু খাও” কোথা থেকে আসে? এটা কি শুধুই পুষ্টির চিন্তা? নাকি এর পেছনে আরো গভীর কিছু আছে? হয়তো এটা ভালোবাসা প্রকাশের একটা উপায়। হয়তো এটা নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়ার চেষ্টা।
মনে পড়ে মায়ের শেষ দিনগুলোর কথা। তখন তিনি নিজেই খেতে পারতেন না। কিন্তু আমি যখন তার কাছে যেতাম, বলতেন, “তুই খেয়েছিস তো ঠিকমতো?” আমি বলতাম, “হ্যাঁ মা।” কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট হতেন না। বলতেন, “আরেকটু খা। তোর শরীরের জন্য ভালো।”
এখন বুঝি সেটা শুধু খাওয়ার কথা ছিল না। সেটা ছিল তার ভালোবাসার শেষ প্রকাশ। যে মানুষটি সারাজীবন আমার জন্য চিন্তা করেছেন, তিনি মৃত্যুশয্যায় পড়েও সেই চিন্তা ছাড়তে পারেননি।
আরাশ যখন বলে “আব্বু, আমি আর পারছি না”, তখন আমার মনে পড়ে আমিও এমনই বলতাম। কিন্তু মা থামতেন না। আর এখন আমিও বলি, “একটুখানি চেষ্টা কর।” এটা কি জেনেটিক? নাকি প্রতিটি প্রজন্মের মায়েরা একই চিন্তা করেন?
হ্যাপি যখন আরাশকে জোর করে আরেকটু খাওয়ানোর চেষ্টা করে, তখন আরাশের মুখে যে বিরক্তির ভাব দেখি, সেটা দেখে নিজেকে মনে পড়ে। এখন বুঝি, মায়েদের এই জিদটা আসলে ভালোবাসা। কিন্তু তখন সেটা বুঝিনি।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “মায়েদের এই যে স্বভাব, এটা কেন? কেন তারা সন্তানের ক্ষুধার চেয়ে বেশি বুঝেন?” মনে হয় উত্তর আসছে মায়ের সেই মুখের দিকে তাকিয়ে।
এখন যখন আমি নিজে বাবা, তখন বুঝি “আরেকটু খাও” শুধু খাবার নিয়ে না। এটা নিয়ে যে সন্তানটা যেন কখনো অভুক্ত না থাকে। যেন তার শরীরে কোনো অভাব না থাকে। যেন সে সুস্থ-সবল থাকে।
আরাশ হয়তো বুঝে না কেন আমরা এত জোর করি। সে যেমন আমি বুঝতাম না মায়ের জোর করাটা। কিন্তু একদিন সেও বুঝবে যখন তার নিজের সন্তান হবে।
কখনো কখনো মনে হয়, “আরেকটু খাও” এই কথাটার মধ্যে একটা পূর্ণ দর্শন লুকিয়ে আছে। জীবনেও আমরা বলি “আরেকটু চেষ্টা কর”, “আরেকটু সহ্য কর”, “আরেকটু এগিয়ে যাও।” হয়তো মায়েরাই প্রথম শেখান কীভাবে নিজের সীমা পেরিয়ে যেতে হয়।
রাতে আরাশ ঘুমিয়ে পড়লে হ্যাপিকে বলি, “তুমি ওকে খুব জোর কর খাওয়ানোর জন্য।” সে বলে, “আমার মা আমার সাথেও এমন করত।” আর আমি বলি, “আমার মাও।”
এভাবেই হয়তো একটা ঐতিহ্য চলে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। “আরেকটু খাও” শুধু একটা কথা নয়, এটা ভালোবাসার ভাষা। এটা চিন্তার প্রকাশ। এটা নিরাপত্তার অনুভূতি।
একটু ভাবনা রেখে যান