ব্লগ

দশটি অ্যালার্মের পরাজয়

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাত ১২টায় ফোনে অ্যালার্ম সেট করি। প্রথমটা সকাল ৬টায়। তারপর ৬:০৫, ৬:১০, ৬:১৫… এভাবে ৭:৩০ পর্যন্ত। মোট দশটা অ্যালার্ম। মনে মনে ভাবি, এত অ্যালার্ম থাকলে তো আর না উঠার কোনো সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু সকালে কী হয় সেটা আমিও ঠিকমতো বুঝি না। প্রথম অ্যালার্ম বাজে ৬টায়। হাতটা নিজে নিজেই বেড়িয়ে গিয়ে সুইচ অফ করে দেয়। এমনকি চোখ খোলেও না। যেন আমার ভিতরের কোনো অংশ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে অ্যালার্ম বন্ধ করার।

৬:০৫-এ আবার বাজে। এবার একটু চোখ খোলে। দেখি ফোনের স্ক্রিনে সময়। মনে হয় “আরো পাঁচ মিনিট পর।” সুইচ অফ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। এই পাঁচ মিনিট যেন পাঁচ সেকেন্ডের মতো মনে হয়।

৬:১০, ৆:১৫, ৆:২০ – এভাবে একটার পর একটা অ্যালার্ম বাজছে আর বন্ধ হচ্ছে। প্রতিবার মনে হয় “এইবার উঠব”, কিন্তু শরীরটা যেন পাথর হয়ে আছে। নড়তে চায় না।

হ্যাপি পাশে ঘুমিয়ে আছে। আশ্চর্যের বিষয় হল সে এত অ্যালার্মের শব্দেও জাগে না। কিভাবে সম্ভব? নাকি জেগে আছে কিন্তু আমার এই দশা দেখে মজা পাচ্ছে?

৭টার অ্যালার্মে একটু বেশি জেগে থাকি। দেখি আকাশ আলো হয়ে গেছে। মনে হয় “এখন সত্যিই উঠতে হবে।” কিন্তু মনের একটা অংশ বলে “আরো একটু। আরো শুধু ১৫ মিনিট।” সেই ১৫ মিনিট বড়ই মধুর লাগে।

৭:১৫-এ যখন অ্যালার্ম বাজে, তখন বুঝি আমি বিপদে পড়েছি। অফিসে যেতে হবে। কিন্তু তবুও মনে হয় “শেষ অ্যালার্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করি।” যেন আমার জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে সেই শেষ ১৫ মিনিটে।

৭:৩০-এ শেষ অ্যালার্ম বাজলে আর কোনো উপায় থাকে না। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ি। মাথা ঝিমঝিম করছে, চোখ জ্বালাপোড়া করছে। এই অবস্থায় তৈরি হওয়া একটা অত্যাচার।

আরাশ প্রায়ই বলে, “আব্বু, আপনার এত অ্যালার্ম কেন? আমি তো একটা অ্যালার্মেই উঠে যাই।” এগারো বছরের একটা ছেলে যেটা পারে, আমি কেন পারি না?

এই অভ্যাসের কারণে কত অপমান সহ্য করেছি। অফিসে দেরি করে গিয়ে বসের তিরস্কার। সহকর্মীদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। সবার সামনে “সরি” বলতে বলতে লজ্জা লেগে যায়।

রাতে আবার অ্যালার্ম সেট করার সময় ভাবি, “আগামীকাল প্রথম অ্যালার্মেই উঠব।” কিন্তু জানি যে এই প্রতিজ্ঞা রাখা হবে না। তবুও আশা করি।

কেন এমন হয় আমার সাথে? অন্য মানুষেরা কি এত কষ্ট করে সকালে ওঠে? নাকি আমারই কোনো সমস্যা আছে? হয়তো আমি একটা নাইট অউল, সকালের মানুষ নই।

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি সকালে উঠতে পারি না? এটা কি আমার চরিত্রের কোনো দুর্বলতা?” মনে হয় উত্তর আসছে – “যে কাজ কঠিন মনে হয়, সেটাই সবচেয়ে জরুরি।”

হ্যাপি একদিন বলেছিল, “তুমি রাতে ঘুমাতে যাও দেরিতে, উঠতে চাও সকালে। এটা তো অবিচার।” তার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু রাত জাগাটাও তো আমি ইচ্ছা করে করি না।

হয়তো একদিন আমি একটা অ্যালার্মেই উঠতে পারব। হয়তো একদিন সকালটা আমার কাছে শত্রু নয়, বন্ধু হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই দিন পর্যন্ত এই দশটি অ্যালার্মের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

প্রতিদিন সকালে পরাজিত হই নিজের কাছেই। কিন্তু আশা ছাড়ি না। আগামীকাল আবার চেষ্টা করব। আবার দশটি অ্যালার্ম সেট করব। কে জানে, হয়তো একদিন জিতে যাব।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *