ভোর সাড়ে পাঁচটায় মোবাইলের অ্যালার্ম বাজল। কিন্তু এই আওয়াজ আমার চেনা অ্যালার্মের নয়। এ যেন শতাব্দী পুরনো কোনো ঘণ্টার শব্দ। ঢং ঢং ঢং – গভীর, কাঁপানো, আত্মার গহীনে পৌঁছানো।
চোখ খুলে দেখি আমি আর আমার বিছানায় নেই। চারদিকে মাটির দেয়াল। কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলছে। বাইরে থেকে গরুর গাড়ির চাকার আওয়াজ।
আমি কোন সময়ে চলে এসেছি?
জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি কাঁচা রাস্তা। মানুষ ধুতি পরে হেঁটে যাচ্ছে। মহিলারা শাড়ির আঁচল মাথায় দিয়ে কলসি নিয়ে চলেছে।
এ যেন আমার দাদুর আমলের গ্রাম।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এই সময়ে এসেও আমার সেই একই সমস্যা। কথা বলতে পারছি না।
একজন বৃদ্ধ মানুষ এসে জিজ্ঞেস করলেন, “বেটা, তুমি কোথা থেকে এসেছ?”
আমি মুখ খুলে কিছু বলতে গেলাম, কিন্তু আওয়াজ বের হলো না। যেন আমার কণ্ঠনালী এই যুগের ভাষা ভুলে গেছে।
তিনি আবার বললেন, “কি হয়েছে? কথা বলতে পারছ না?”
আমি মাথা নাড়লাম। তিনি দুঃখের সাথে বললেন, “বেচারা বোবা।”
বুঝলাম, কোন যুগেই গেলেও আমি বোবা থেকে যাব। সমস্যা সময়ে নয়, আমার ভেতরে।
এক শতাব্দী আগের মানুষেরাও আমাকে বুঝতে পারবে না। এক শতাব্দী পরের মানুষেরাও পারবে না।
গ্রামের মানুষদের দেখতে লাগলাম। তারা সহজ জীবনযাপন করছে। কিন্তু তাদের চোখেও সেই একই প্রশ্ন – এই অচেনা মানুষটা কে?
সন্ধ্যায় মসজিদে আজানের আওয়াজ শুনলাম। সেই আওয়াজ শুনে মনে হলো, আল্লাহর ডাক সব যুগেই একই।
কিন্তু আমি কোন যুগেই তার কাছে নিজের কথা পৌঁছাতে পারি না।
রাতে একটা খড়ের বিছানায় শুয়ে ভাবলাম, এই যুগে কি আমার জীবন ভিন্ন হতো? আমি কি কৃষক হতাম? কামার হতাম? তাঁতি হতাম?
কিন্তু যে পেশাই হোক, আমার মূল সমস্যা থেকে যেত। মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারতাম না।
ভোরে আবার সেই অ্যালার্মের আওয়াজ। ঢং ঢং ঢং।
চোখ খুলে দেখি আমি আমার নিজের বিছানায়। মোবাইল ফোন হাতের কাছে। হ্যাপি রান্নাঘরে ব্যস্ত।
কিন্তু গতরাতের অভিজ্ঞতা এত স্পষ্ট যে মনে হচ্ছে সত্যি।
হয়তো সেই অ্যালার্ম আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমার সমস্যা কালের নয়, চিরকালের।
আমি যে যুগেই থাকি, নিজের কাছেই অচেনা থেকে যাব।
তবু একটা সান্ত্বনা পেলাম। প্রতিটি যুগেই আমার মতো কেউ না কেউ আছে। যারা মানুষের ভিড়ে একা।
হয়তো এটাই মানুষ হওয়ার একটা শর্ত।
একটু ভাবনা রেখে যান