আজ আরাশ বিজ্ঞানের বই পড়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আলো কী? তরঙ্গ নাকি কণা?”
আমি ভাবলাম। “দুটোই,” আমি বললাম।
“কেমন দুটোই? একটা জিনিস কীভাবে দুরকম হয়?”
আমি বুঝিয়ে বললাম, “আলো কখনো তরঙ্গের মতো আচরণ করে, কখনো কণার মতো। নির্ভর করে তুমি কীভাবে দেখছো।”
আরাশ অবাক হয়ে বলল, “তাহলে আমরা কীভাবে দেখি তার উপর নির্ভর করে জিনিসের প্রকৃতি বদলায়?”
আমি হেসে বললাম, “ঠিক বলেছিস।”
কিন্তু পরে ভাবলাম—এটা কি শুধু আলোর ব্যাপার? নাকি আমাদের জীবনেও এরকম?
আমি কে? হায়দার। কিন্তু আরাশের কাছে আমি বাবা। হ্যাপির কাছে স্বামী। অফিসে কর্মচারী। বন্ধুদের কাছে বন্ধু।
প্রতিটি ভূমিকায় আমি আলাদা মানুষ। যেন আলোর মতো—কখনো তরঙ্গ, কখনো কণা।
আরাশের সামনে আমি ধৈর্যশীল, শেখানোর মানুষ। হ্যাপির সামনে রোমান্টিক, কখনো জেদি। অফিসে পেশাদার। বন্ধুদের সাথে হাসিখুশি।
কোনটা আসল আমি?
হয়তো সবগুলোই। যেমন আলো—কখনো তরঙ্গ, কখনো কণা। কিন্তু দুটোই আসল।
হ্যাপিকে বললাম, “তুমি কি মনে করো আমি একই মানুষ? সব সময়?”
“না তো। আরাশের সামনে তুমি অন্যরকম। আমার সামনে আরেকরকম।”
“কোনটা পছন্দ?”
“সব। কারণ সবগুলো মিলেই তো তুমি।”
আমি বুঝলাম। মানুষের এই দ্বৈততাই স্বাভাবিক। আমরা একসাথে অনেক কিছু।
আমি একসাথে শক্ত আবার নরম। আত্মবিশ্বাসী আবার সন্দেহপ্রবণ। আশাবাদী আবার হতাশ।
পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন দিক প্রকাশ পায়।
চাকরির ইন্টারভিউতে আমি আত্মবিশ্বাসী। বাসায় এসে অনিশ্চিত। বন্ধুদের সাথে হালকা। একা থাকলে গভীর।
এই বিভিন্ন রূপ কি আমার দুর্বলতা? নাকি শক্তি?
আমার মনে হল—এটা শক্তি। কারণ এভাবেই আমি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারি।
যেমন আলো। যখন তরঙ্গ হিসেবে আচরণ করতে হয়, তখন তরঙ্গ। যখন কণা, তখন কণা।
আরাশও এরকম। স্কুলে সে ছাত্র। বাসায় ছেলে। বন্ধুদের সাথে খেলোয়াড়। একা থাকলে চিন্তাশীল।
হ্যাপিও। অফিসে প্রফেশনাল। বাসায় মা। আমার সাথে স্ত্রী। নিজের মায়ের সাথে মেয়ে।
আমরা সবাই বহুমুখী।
কিন্তু সমস্যা হয় যখন আমরা একটা পরিচয়ে আটকে যাই। যখন ভুলে যাই যে আমরা আরো অনেক কিছু।
আমি যখন শুধু “বেকার” হয়ে থাকি, তখন ভুলে যাই যে আমি “বাবা” “স্বামী” “বন্ধু”ও।
আমি যখন শুধু “ব্যর্থ” মনে করি নিজেকে, ভুলে যাই যে অন্য ক্ষেত্রে “সফল”।
কোয়ান্টাম ফিজিক্সে একটা কথা আছে—”অবজার্ভার ইফেক্ট।” যেভাবে দেখি, সেভাবেই আচরণ করে।
আমার জীবনেও তাই। আমি নিজেকে যেভাবে দেখি, সেভাবেই আচরণ করি।
আমি যদি নিজেকে “ভিকটিম” মনে করি, তাহলে দুর্বল আচরণ করি। “যোদ্ধা” মনে করলে শক্তিশালী আচরণ করি।
তাহলে আমার করণীয় কী? নিজের সব রূপকে স্বীকার করা। বুঝা যে আমি একটা জটিল মানুষ।
কখনো শক্তিশালী, কখনো দুর্বল। কখনো আশাবাদী, কখনো হতাশ। এসবই আমার অংশ।
আর প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক রূপটা বেছে নেওয়া। যেমন আলো—প্রয়োজনে তরঙ্গ, প্রয়োজনে কণা।
আরাশকে বললাম, “তুমি জানো, তুমিও আলোর মতো?”
“কেমন?”
“তুমি একসাথে অনেক কিছু। ছাত্র, ছেলে, বন্ধু, খেলোয়াড়। সব পরিচয়ই সত্যি।”
আরাশ খুশি হয়ে বলল, “তাহলে আমার অনেক রূপ?”
“হ্যাঁ। আর সেটাই তোমার শক্তি।”
এই উপলব্ধিটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—আমরা একটা নই, অনেকগুলো। আর এই বৈচিত্র্যই আমাদের সুন্দর করে তোলে।
একটু ভাবনা রেখে যান