কথা

স্যার

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল অফিসে একটা নতুন ছেলে এসেছে। সে আমাকে “স্যার” বলে ডাকল।

আমি চা-এর কাপ থেকে মুখ তুললাম। ছেলেটার বয়স বাইশ-তেইশ হবে। চোখে ভয় মেশানো সম্মান।

দশ বছর আগে আমিও এমন তাকাতাম। সিনিয়রদের দেখলে বুক ধড়ফড় করত।


বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বললাম, আজ একটা ছেলে আমাকে স্যার বলেছে।

হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বলল, তাতে?

জানি না। অদ্ভুত লাগল।

কেন অদ্ভুত?

আমি চুপ করে রইলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। একটা কাক উড়ে গেল।


আরাশ তখন মেঝেতে বসে ছবি আঁকছিল। সে জিজ্ঞেস করল, স্যার মানে কী?

যাকে সম্মান করো।

তোমাকে সম্মান করে?

মনে হয়।

আরাশ আবার ছবি আঁকতে লাগল। বলল, আমিও তোমাকে সম্মান করি। কিন্তু স্যার বলি না।

তুমি বাবা বলো।

বাবা আর স্যার কি এক?

আমি উত্তর দিলাম না।


রাতে বিছানায় শুয়ে মনে পড়ল — আরাশ জন্মানোর পরদিন নার্স এসে বলেছিল, বাবা, বাচ্চাকে ধরুন।

সেই প্রথম কেউ আমাকে বাবা বলল।

আমি বাচ্চাটাকে হাতে নিয়েছিলাম। এত ছোট। এত হালকা। মনে হচ্ছিল ভুল করে অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছে।

আমি তো গতকালও নিজেকে বাচ্চা ভাবতাম।


হ্যাপির সাথে প্রথম দেখা — বারো বছর আগে। বন্ধুর বাড়িতে।

সেদিন আমি চুল আঁচড়ে গিয়েছিলাম। নতুন জামা পরেছিলাম। কথা বলার সময় গলার স্বর বদলে ফেলেছিলাম।

পরে বাড়ি ফিরে আয়নায় তাকিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এটা কে?


গত সপ্তাহে সাইফুলের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাবুও ছিল।

সাইফুল বলল, তোর কী হয়েছে রে? এত চুপচাপ কেন?

বাবু বলল, বিয়ের পর থেকেই এমন। আগে তো হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করে দিতি।

আমি হাসলাম। বললাম, বয়স হয়েছে।

সাইফুল বলল, বয়স তো আমাদেরও হয়েছে।

চুপ করে রইলাম। চায়ে চুমুক দিলাম। চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।


অফিসে আমি একরকম থাকি।

সকাল ন’টায় ঢুকি। “গুড মর্নিং” বলি। কম্পিউটার খুলি। মিটিংয়ে যাই। মাথা নাড়ি। নোট লিখি।

বাড়িতে আরেকরকম।

টিভির সামনে বসে থাকি। আরাশের সাথে খেলি। হ্যাপির সাথে খাই। ঘুমাই।

দুটো জায়গায় দুটো আলাদা মানুষ।

কোনটা আমি?


আজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাড়ি কামাচ্ছিলাম। আরাশ এসে পাশে দাঁড়াল।

বাবা, তুমি কেন সব সময় একরকম?

মানে?

একই কথা বলো। একই কাজ করো।

সবাই তো করে।

আম্মু করে না। আম্মু মাঝে মাঝে অন্যরকম হয়।

কীরকম?

মাঝে মাঝে হাসে। মাঝে মাঝে রাগ করে। মাঝে মাঝে গান গায়।

আমি আয়নায় তাকালাম। আমার মুখটা একরকম। কপালে ভাঁজ। চোখে ক্লান্তি।

তুমি কি কখনো গান গাও? আরাশ জিজ্ঞেস করল।

গাইতাম। আগে।

কবে আগে?

অনেক আগে।


মা বেঁচে থাকতে আমি গান গাইতাম।

মা বলত, তোর গলা ভালো। গান শেখ।

শিখিনি। সময় পাইনি। পরীক্ষা ছিল। চাকরি ছিল। সংসার ছিল।

এখন মা নেই। বাবাও নেই।

গানও নেই।


২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। তিন মাস বাড়িতে বসে ছিলাম।

সেই তিন মাস অদ্ভুত ছিল।

সকালে উঠতাম। কোথাও যেতাম না। কিছু করতাম না।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করত, কেমন লাগছে?

বলতাম, জানি না।

ভালো না খারাপ?

দুটোই না।


সেই তিন মাসে আমি বুঝতে পারতাম না আমি কে।

অফিস নেই। তাহলে আমি চাকুরিজীবী না।

বাইরে যাই না। তাহলে আমি কীসের মানুষ?

শুধু বাবা? শুধু স্বামী?

এটুকুই কি আমি?


একদিন আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা, তুমি কী করো?

বললাম, কিছু না।

কিছু না মানে?

মানে… এখন কিছু করি না।

তাহলে তুমি কে?

আমি তোমার বাবা।

সেটা তো জানি। কিন্তু আর কী?

চুপ করে ছিলাম।


নতুন চাকরিতে ঢুকলাম। আবার সকাল ন’টায় অফিস। আবার মিটিং। আবার নোট।

হ্যাপি বলল, এখন কেমন লাগছে?

বললাম, স্বাভাবিক।

স্বাভাবিক মানে ভালো?

স্বাভাবিক মানে… আগের মতো।


গতকাল সেই নতুন ছেলেটা আবার এল।

স্যার, এই ফাইলটা দেখবেন?

আমি ফাইল নিলাম। ছেলেটা দাঁড়িয়ে রইল।

বসো।

সে বসল। চেয়ারের একদম কিনারায়।

আমি বললাম, নাম কী তোমার?

রাকিব।

কত বছর?

তেইশ।

ভয় লাগছে?

একটু।

আমি হাসলাম। বললাম, আমারও লাগত।


রাতে হ্যাপিকে বললাম, আজ ছেলেটার সাথে কথা বললাম।

কী বললে?

বললাম আমারও ভয় লাগত।

হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, এখন লাগে না?

কী?

ভয়।


জানালা খোলা ছিল। বাইরে অন্ধকার। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল।

আমি বললাম, জানি না।


আজ সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আরাশ দৌড়ে এল।

বাবা, একটা কথা।

বলো।

তুমি কি সুখী?

আমি জুতার ফিতে বাঁধছিলাম। হাত থেমে গেল।

কেন জিজ্ঞেস করছ?

এমনি।

দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আরাশ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে কোনো বিচার নেই। শুধু জিজ্ঞাসা।

বললাম, পরে বলব।


অফিসে বসে আছি। জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। মেঘ নেই।

রাকিব এসে বলল, স্যার, চা?

আমি মাথা নাড়লাম।

সে চা দিয়ে গেল।

চায়ে ধোঁয়া উঠছে।


আরাশের প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছে।

তুমি কি সুখী?

বাচ্চারা এমন প্রশ্ন করে কীভাবে? এত সহজে?

বড়রা জিজ্ঞেস করে — কেমন আছ? ব্যবসা কেমন? স্বাস্থ্য ঠিক আছে?

কেউ জিজ্ঞেস করে না — তুমি কি সুখী?


বিকেলে বাড়ি ফিরলাম।

আরাশ দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।

বলবে?

কী?

সকালের উত্তর।

আমি ব্যাগ রাখলাম। জুতো খুললাম।

আরাশ অপেক্ষা করছে।

বললাম, সুখ কী জিনিস জানো?

না।

আমিও জানি না।

তাহলে?


হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বলল, খেতে আয়।

আমরা গেলাম।

টেবিলে ভাত, ডাল, মাছ।

আরাশ বলল, আম্মু, তুমি কি সুখী?

হ্যাপি থামল। হাতে ভাতের হাঁড়ি।

সে আমার দিকে তাকাল। আমি তার দিকে।

হ্যাপি বলল, এখন খাও। পরে বলব।


রাতে শুয়ে আছি।

হ্যাপি পাশে। ঘুমিয়ে গেছে।

ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি।

সুখ কী জিনিস?

জানি না।


মা মারা যাওয়ার পর বাবা একা থাকতেন।

একদিন ফোন করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছ?

বাবা বললেন, আছি।

সুখী?

বাবা চুপ করে রইলেন। অনেকক্ষণ।

তারপর বললেন, তোমার মা থাকলে জানতাম।


বাবাও নেই এখন।


আজ সকালে আয়নায় তাকালাম।

চোখের নিচে কালি। চুলে একটা-দুটো সাদা।

এই মুখ চিনি। এই মুখ আমার।

কিন্তু ভেতরে কে আছে?


অফিসে রাকিব জিজ্ঞেস করল, স্যার, আপনি কত বছর ধরে এখানে?

দশ বছর।

অনেক দিন।

হ্যাঁ।

ভালো লাগে?

চুপ করে রইলাম।

রাকিব অপেক্ষা করছে।

বললাম, অভ্যাস হয়ে গেছে।


বাড়ি ফেরার পথে রিকশায় বসে ভাবছিলাম।

দশ বছর আগে যে ছেলে এই অফিসে ঢুকেছিল, সে কোথায়?

সে ভয় পেত। সে স্বপ্ন দেখত। সে ভাবত একদিন অন্য কিছু হবে।

এখন?

এখন আমি স্যার।


রিকশা থেকে নামলাম।

আরাশ গেটে দাঁড়িয়ে।

বাবা, আজ কী করলে?

কাজ।

কাজ মানে কী?

মানে… অফিসের কাজ।

মজা?

না।

তাহলে কেন করো?


কেন করি?

টাকার জন্য। সংসারের জন্য। তোমার জন্য।

কিন্তু এটুকুই উত্তর?


রাতে খাওয়ার সময় হ্যাপি বলল, আজ তুমি চুপচাপ।

আরাশ বলল, বাবা সব সময় চুপচাপ।

হ্যাপি হাসল।

আমি হাসলাম না।


ঘুমের আগে আরাশ এল।

বাবা, একটা গল্প বলো।

কোন গল্প?

যে কোনো।

আমি ভাবলাম। কোনো গল্প মনে পড়ল না।

বললাম, আগামীকাল বলব।

প্রতিদিন আগামীকাল বলো।


আরাশ চলে গেল।

আমি জানালার কাছে দাঁড়ালাম।

বাইরে চাঁদ উঠেছে। অর্ধেক চাঁদ।

একটা গল্পও মনে নেই।

কবে ভুলে গেলাম সব?


হ্যাপি ডাকল, ঘুমাবে না?

আসছি।


বিছানায় শুয়ে আছি।

স্যার। বাবা। স্বামী।

কোনটা আমি?

নাকি কোনোটাই না?


ঘুম এল না।

জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে।

হ্যাপি ঘুমিয়ে আছে।

পাশের ঘরে আরাশ ঘুমিয়ে আছে।

আমি জেগে আছি।


সকালে আরাশ জিজ্ঞেস করবে — বাবা, গল্প?

কী বলব?

হয়তো বলব — একটা ছেলে ছিল। সে বড় হতে চাইত।

তারপর?

তারপর সে বড় হল।

তারপর?

তারপর সে ভুলে গেল ছোট ছিল।


জানালার বাইরে আকাশ ফর্সা হচ্ছে।

আরেকটা দিন শুরু হবে।

আমি উঠব। দাড়ি কামাব। অফিসে যাব।

রাকিব বলবে — স্যার।

আমি মাথা নাড়ব।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *