ব্লগ

আওয়াজ

নভেম্বর ২০২৫ · 12 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ তার খাতা খুলল। অঙ্ক করছে।

আমি বললাম, “পড়াশোনায় মন দাও।”

আরাশ তাকাল না।

“ভবিষ্যতের কথা ভাব,” আমি বললাম। “এইসব নষ্টামি ছাড়।”

আরাশ পেন্সিল নামিয়ে রাখল। তাকাল আমার দিকে।

“কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“তুমি দাদুর মতো কথা বলছ।”

আমি থামলাম। “কী বললি?”

“দাদু তোমাকে এভাবে বলত। তুমি আমাকে বলেছিলে।”

আমি মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ। বাবা আমাকে এই কথাগুলো বলত। প্রতিদিন।

“তুমি কি দাদুর মতো হতে চাও?” আরাশ জিজ্ঞেস করল।

“না।”

“তাহলে কেন তার মতো কথা বলছ?”

আমার মুখে কোনো উত্তর এলো না।

আরাশ আবার অঙ্ক করতে লাগল।

আমি বেরিয়ে এলাম।


অফিসে মিটিং। আমার সামনে সাদা কাগজ। ফাঁকা।

বস বলল, “তোমার প্ল্যান কী?”

আমি দাঁড়ালাম। মুখ খুললাম।

“আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। গ্রাহকদের সন্তুষ্টি আমাদের প্রথম কাজ। একসাথে কাজ করলেই সফল হব।”

বস মাথা নাড়ল। “ভালো।”

বসলাম। ভাবলাম, এটা কি আমার কথা ছিল?

ফারুক ফিসফিস করল, “তুই শামসুল স্যারের মতো কথা বলিস।”

শামসুল স্যার আমার আগের বস। তিন বছর আগে চলে গেছেন।

“কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“একই কথা। একই সুর। এমনকি হাত নাড়ানোটাও।”

আমি আমার হাত দেখলাম। এগুলো কি আমার হাত? নাকি শামসুল স্যারের?


হ্যাপি বলল, “তুমি কখনো আমার কথা শোনো না।”

আমি বললাম, “মেয়েরা অনেক কিছু বোঝে না।”

হ্যাপি থামল। তাকাল আমার দিকে।

“তুমি কি সত্যি এটা বিশ্বাস করো?”

আমি ভাবলাম। আমি কি বিশ্বাস করি?

“তোমার ভাই এরকম বলত,” হ্যাপি বলল। “তুমি আমাকে বলেছিলে তুমি তার মতো না।”

আমার ভাই। মারা গেছে দশ বছর হলো। কিন্তু তার কথাগুলো বেঁচে আছে। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে।

“আমি… জানি না,” আমি বললাম।

“তুমি জানো না তুমি কী বিশ্বাস করো?”

“না।”

হ্যাপি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আমি বসে রইলাম। আমার হাত দুটো কোলে। ভারী লাগছিল।


জামিউর বলল, “এই সরকার একদম ব্যর্থ।”

“হ্যাঁ,” আমি বললাম। “বিরোধীরাও কোনো কাজের না।”

“ঠিক। দেশের মানুষই শুধু ভুগছে।”

“হ্যাঁ।”

আমরা চুপ করে চা খেলাম।

“তুই আসলে কী মনে করিস?” জামিউর জিজ্ঞেস করল।

“মানে?”

“সরকার নিয়ে। তোর নিজের মত কী?”

আমি ভাবলাম। আমার নিজের মত। কী সেটা?

টিভিতে যা দেখি। পত্রিকায় যা পড়ি। লোকে যা বলে। এগুলো তো আমার মত না।

“জানি না,” আমি বললাম।

“কীভাবে জানিস না? তুই তো এত কথা বলিস।”

“ওগুলো… ওগুলো সবার কথা। আমার না।”

জামিউর তাকাল। তারপর আবার চা খেল।

আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম।


নামাজের পর ইমাম সাহেব বললেন, “ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ দয়ালু।”

আমি মাথা নাড়লাম।

বাড়ি ফেরার পথে ভাবলাম, আমি কি এটা বিশ্বাস করি?

বাবা বলত এই কথা। মা বলত। সবাই বলে।

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি?

জানি না।

আমি জানি না আমি কী বিশ্বাস করি।


রাতে খাতা খুলে বসলাম। লিখতে চাইলাম কিছু।

কী লিখব?

আমার মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। আমি কবিতা লিখতাম। লুকিয়ে লুকিয়ে।

একটা কবিতা মনে আছে। মেঘের কথা ছিল। আর একা থাকার কথা।

কাউকে দেখাইনি কখনো।

বাবা জানতে পারল একদিন। বলল, “এসব দিয়ে কী হবে? পেট ভরবে?”

আমি খাতা লুকিয়ে রাখলাম।

আর কখনো কবিতা লিখিনি।

এখন হাতে কলম। সাদা কাগজ।

কিন্তু কী লিখব? আমার নিজের কোনো কথা আছে?


হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি সুখী?”

“হ্যাঁ।”

“সত্যি?”

আমি ভাবলাম। “জানি না। এটা কি সঠিক উত্তর?”

“সঠিক মানে?”

“মানে… তুমি কী শুনতে চাও?”

হ্যাপি বসল আমার পাশে। “আমি তোমার কথা শুনতে চাই। অন্য কারো না।”

“আমার কথা কী?”

“তুমি কী মনে করো। তুমি কী অনুভব করো।”

আমি তাকালাম তার দিকে। “যদি জানি না?”

“তাহলে?”

“তাহলে কী?”

হ্যাপি হাসল। দুঃখের হাসি। “তাহলে আমরা দুজনেই হারিয়ে গেছি।”


আরাশ স্কুল থেকে ফিরল। বলল, “বাবা, আমাকে একটা কথা বলো।”

“কী?”

“তুমি কী চাও?”

“মানে?”

“তুমি কী হতে চেয়েছিলে? বড় হয়ে।”

আমি ভাবলাম। আমি কী হতে চেয়েছিলাম?

“কবি,” আমি বললাম। “হয়তো।”

“তাহলে কবি হওনি কেন?”

“কারণ… কারণ বাবা বলেছিল পেট ভরে না।”

“তুমি তখন কী বলেছিলে?”

“কিছু বলিনি।”

আরাশ তার ব্যাগ খুলল। একটা খাতা বের করল।

“এই দেখো। আমি গল্প লিখি। কাউকে দেখাই না।”

আমি খাতা খুললাম। ছোট ছোট হাতের লেখা। একটা ছেলের গল্প যে উড়তে পারে।

“এটা সুন্দর,” আমি বললাম।

“তুমি আমাকে বলবে পেট ভরবে না?”

আমি তাকালাম আরাশের দিকে। তার চোখ দুটো। অপেক্ষায়।

“না,” আমি বললাম। “আমি তোমাকে বলব লিখতে থাকো।”

আরাশ হাসল। খাতা নিয়ে চলে গেল।

আমি বসে রইলাম।

আমি কি এইমাত্র আমার কথা বললাম? নাকি আবার অন্য কারো?

জানি না।


রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম।

আমি একটা ঘরে। চারপাশে আয়না। প্রতিটা আয়নায় একজন মানুষ।

একজন আমার বাবা। একজন শামসুল স্যার। একজন আমার ভাই। একজন ইমাম সাহেব।

সবাই কথা বলছে। একসাথে। আমার মুখ দিয়ে।

আমি চিৎকার করতে চাইলাম। কিন্তু আওয়াজ বেরোলো না।

ঘুম ভাঙল।

হ্যাপি পাশে ঘুমাচ্ছে। আরাশের ঘর থেকে শব্দ নেই।

আমি উঠে গেলাম বারান্দায়। রাত তখন তিনটা।

ভাবলাম, আমার নিজের আওয়াজ কোথায়?


পরের দিন অফিসে বস জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী মনে করো?”

“আমি?”

“হ্যাঁ। তোমার মতামত।”

আমি মুখ খুললাম। তারপর বন্ধ করলাম।

“আমি জানি না,” আমি বললাম।

“কীভাবে জানো না?”

“আমি… আমি ভাবতে পারি না। আমার মাথায় শুধু অন্যদের কথা আসে।”

বস তাকাল আমার দিকে। অদ্ভুতভাবে।

“তুমি কি ঠিক আছো?”

“জানি না। হয়তো না।”

বস কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।

আমি বেরিয়ে এলাম।


জামিউরকে ফোন করলাম। “তুই কি নিজের মতো কথা বলিস?”

“কী?”

“তুই যা বলিস, সেগুলো কি তোর নিজের কথা?”

জামিউর চুপ রইল কিছুক্ষণ। “জানি না। কখনো ভাবিনি।”

“ভাব।”

“কেন?”

“কারণ আমি ভাবছি। আর আমার মনে হচ্ছে আমার কোনো নিজের কথা নেই।”

“সবার মনেই তো এরকম লাগে। তাই না?”

“জানি না। লাগে?”

“হয়তো।”

আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম।

“তুই কি ভালো আছিস?” জামিউর জিজ্ঞেস করল।

“জানি না।”

ফোন রাখলাম।


হ্যাপি বলল, “তুমি অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছো।”

“কীভাবে?”

“তুমি সব কিছুতে বলছ জানি না। তুমি কি সত্যিই কিছু জানো না?”

আমি ভাবলাম। “আমি জানি যে আমি জানি না।”

“এটা কী ধরনের উত্তর?”

“সত্য উত্তর। হয়তো।”

হ্যাপি বসল। “তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছ।”

“কেন?”

“কারণ… কারণ তুমি আগে এরকম ছিলে না।”

“আগে আমি কেমন ছিলাম?”

“তুমি জানতে। তুমি নিশ্চিত ছিলে। তুমি কথা বলতে।”

“কিন্তু সেগুলো কি আমার কথা ছিল?”

হ্যাপি তাকাল আমার দিকে। তার চোখে পানি।

“আমি জানি না,” সে বলল। “আমি কখনো জানতাম না তুমি আসলে কী ভাবো।”


আরাশ তার খাতা দেখাল। নতুন গল্প। একটা মানুষের গল্প যে নিজের ছায়া হারিয়ে ফেলেছে।

“এটা কার কথা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“জানি না। হয়তো তোমার।”

আমি পড়লাম। গল্পে মানুষটা খুঁজে বেড়ায় তার ছায়া। কিন্তু পায় না।

“শেষে কী হয়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“এখনো লিখিনি। তুমি বলো শেষে কী হওয়া উচিত?”

আমি ভাবলাম। “জানি না। হয়তো সে খুঁজেই পায় না।”

“তাহলে?”

“তাহলে সে শেখে ছায়া ছাড়া থাকতে।”

আরাশ লিখল কিছু। তারপর বলল, “বাবা, তুমি কি তোমার ছায়া হারিয়েছ?”

আমি হাসলাম। “হয়তো। হয়তো আমার কখনো ছায়াই ছিল না।”

“সবার ছায়া থাকে।”

“তুমি কীভাবে জানো?”

আরাশ তাকাল জানালা দিয়ে। সূর্যের আলো পড়ছে।

“দেখো,” সে বলল। “তোমার ছায়া ওখানে। মেঝেতে।”

আমি তাকালাম। হ্যাঁ। একটা ছায়া। কালো। লম্বা।

“এটা কি আমার?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

আরাশ হাসল। “পাগল হয়ে যাচ্ছো?”

হয়তো।


রাতে আমি আবার লিখতে বসলাম।

কী লিখব?

আমার কোনো কথা নেই। আমার কোনো আওয়াজ নেই।

কিন্তু তবু হাত নড়ছে। কলম চলছে।

লিখলাম: “আমি জানি না।”

তারপর লিখলাম: “আমি জানি না আমি কে।”

তারপর: “আমি জানি না আমি কী বলছি।”

তারপর: “কিন্তু আমি বলছি।”

থামলাম। পড়লাম যা লিখেছি।

এটা কি আমার আওয়াজ? যে বলে সে জানে না?

হয়তো।

হয়তো না।

কিন্তু অন্তত এটা সৎ।


হ্যাপি এসে দাঁড়াল আমার পেছনে। “কী লিখছ?”

“জানি না।”

“দেখাও।”

আমি দেখালাম।

সে পড়ল। তারপর বলল, “এটা তোমার মতো শোনাচ্ছে।”

“কীভাবে বুঝলে?”

“কারণ এখানে কোনো নিশ্চয়তা নেই। কোনো উত্তর নেই।”

“এটা কি ভালো?”

“জানি না। কিন্তু এটা সত্য।”

আমি তাকালাম হ্যাপির দিকে। “তুমি কি আমাকে চেনো?”

“না। তুমি?”

“না।”

“তাহলে আমরা একসাথে শিখব,” হ্যাপি বলল।

সে চলে গেল।

আমি আবার লিখতে শুরু করলাম।

জানি না কী লিখছি। কিন্তু লিখছি।

হয়তো এটাই আমার আওয়াজ। যে স্বীকার করে সে হারিয়ে গেছে।

যে খোঁজে। যে ভুল করে। যে জানে না।

হয়তো এই না-জানাটাই সবচেয়ে সত্য।


পরের দিন অফিসে বস জিজ্ঞেস করল, “তোমার মতামত?”

আমি দাঁড়ালাম।

মুখ খুললাম।

তারপর বন্ধ করলাম।

তারপর আবার খুললাম।

“আমার মনে হয়,” আমি বললাম, “আমার মনে হয় এই পরিকল্পনা ভুল।”

সবাই তাকাল আমার দিকে।

“কেন?” বস জিজ্ঞেস করল।

“কারণ… কারণ এটা আমার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে না।”

“তোমার কাছে?”

“হ্যাঁ। আমার।”

বস মাথা নাড়ল। “বলো। কী ঠিক মনে হচ্ছে না?”

আমি বললাম। আমার নিজের কথা। অনিশ্চিত। ভাঙা। কিন্তু আমার।

কেউ রাগ করল না। কেউ হাসল না।

বস বলল, “চিন্তা করব।”

মিটিং শেষ।

ফারুক বলল, “আজ তুই তোর মতো শোনাচ্ছিলি।”

“কীভাবে বুঝলি?”

“জানি না। কিন্তু আলাদা লাগছিল।”


আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি তোমার আওয়াজ পেয়েছ?”

“জানি না। হয়তো।”

“কেমন শোনাচ্ছে?”

“ভাঙা। অনিশ্চিত।”

“এটা কি খারাপ?”

“জানি না। কিন্তু এটা আমার।”

আরাশ হাসল। “তাহলে ভালো।”

সে তার গল্পের খাতা খুলল। শেষ লাইন পড়ল:

“মানুষটা তার ছায়া খুঁজে পেল না। কিন্তু সে হাঁটতে শিখল। ছায়া ছাড়াই।”

আমি বললাম, “সুন্দর।”

“এটা তোমার জন্য,” আরাশ বলল।

“কেন?”

“কারণ তুমি হাঁটছো। জানো না কোথায় যাচ্ছো। কিন্তু হাঁটছো।”


রাতে হ্যাপির পাশে শুলাম।

সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি এখন ভালো?”

“জানি না।”

“কিন্তু তুমি আলাদা।”

“কীভাবে?”

“তুমি এখন নিজের কথা বলছ। জানি না বলছ, কিন্তু সেটা তোমার জানি না।”

আমি হাসলাম। “এটা কি যথেষ্ট?”

“জানি না। কিন্তু এটা শুরু।”

আমরা চুপ করে শুয়ে রইলাম।

ফ্যানের শব্দ। বাইরে গাড়ির শব্দ।

হ্যাপি বলল, “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”

“জানি না। কিন্তু তুমি না থাকলে আমি আরো হারিয়ে যেতাম।”

“এটা কি ভালোবাসা?”

“জানি না। হয়তো এটাই ভালোবাসা।”

হ্যাপি আমার হাত ধরল।

আমরা দুজনেই চোখ বন্ধ করলাম।

জানি না আমি ঘুমিয়ে পড়ব কিনা।

জানি না কাল আমি কী বলব।

জানি না আমার আওয়াজ কখনো পরিষ্কার হবে কিনা।

কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে, আমি এটুকু জানি:

আমি বলছি জানি না।

আর এটা আমার কথা।

অনিশ্চিত। ভীত। হারিয়ে যাওয়া।

কিন্তু আমার।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *