কথা

স্বাভাবিক

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকালে বাসে উঠলাম।

সবাই জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। একই ভঙ্গিতে। মাথা একটু কাত করে।

আমিও তাকালাম। একই ভঙ্গিতে। মাথা একটু কাত করে।

বাস চলছে। রাস্তায় গাড়ি। মানুষ। রিকশা।

পাশের লোকটা ফোন বের করল। স্ক্রিন স্ক্রল করতে লাগল।

আমিও ফোন বের করলাম। স্ক্রল করতে লাগলাম।

কিছু পড়ছি না। শুধু আঙুল চালাচ্ছি।


অফিসে পার্টি ছিল গত সপ্তাহে।

সবাই দাঁড়িয়ে কথা বলছে। হাতে প্লেট। মুখে হাসি।

আমিও প্লেট নিলাম। দাঁড়ালাম। হাসলাম।

সাইফুল বলল, “মজা হচ্ছে?”

“হ্যাঁ, খুব।”

সে অন্য কারো সাথে কথা বলতে গেল।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। প্লেটে সিঙ্গারা। ঠান্ডা হয়ে গেছে।

পাশে দুজন হাসছে। জোরে।

আমিও হাসলাম। একটু জোরে।

কী নিয়ে হাসছি জানি না।


শনিবার আরাশকে নিয়ে পার্কে গেলাম।

অন্য বাবারা বাচ্চাদের সাথে খেলছে। দৌড়াচ্ছে। ধরাধরি করছে।

আমিও দৌড়ালাম। আরাশকে ধরলাম। ওকে উপরে ছুড়ে দিলাম।

সে চিৎকার করল, “আবার!”

আবার ছুড়লাম।

পাশের বাবা তার ছেলেকে ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চড়াচ্ছে।

আমিও হাঁটু গেড়ে বসলাম।

“আরাশ, চড়ো।”

সে চড়ল।

আমি হাঁটতে লাগলাম। হাঁটু ব্যথা করছে। মাটি শক্ত।

কিন্তু হাসলাম।


রাতে হ্যাপিকে নিয়ে বাইরে খেতে গেলাম।

পাশের টেবিলে একটা দম্পতি। হাত ধরাধরি করে বসে আছে। চোখে চোখ রেখে কথা বলছে।

আমি হ্যাপির হাত ধরলাম।

সে অবাক হয়ে তাকাল।

“কী হলো?”

“কিছু না।”

সে হাসল।

আমিও হাসলাম।

খাবার এলো। খেলাম। কথা বললাম।

বাড়ি ফেরার পথে হ্যাপি বলল, “আজকে তুমি অন্যরকম ছিলে।”

“কীরকম?”

“জানি না। যেন চেষ্টা করছিলে।”

চুপ করে রইলাম।


জামিউরের সাথে চা খেতে বসলাম।

সে বলল, “অফিস কেমন?”

“ঠিকঠাক।”

“বাড়ি?”

“ভালো।”

“স্বাস্থ্য?”

“ভালো।”

এই কথাগুলো সবাই বলে। আমিও বললাম।

সে বলল, “তুই কি সত্যিই ভালো আছিস?”

“হ্যাঁ।”

“তোর চেহারা দেখে মনে হয় না।”

“ঘুম কম হয়েছে।”

সে মাথা নাড়ল।

আমরা চা খেলাম। রাজনীতি নিয়ে কথা বললাম। ক্রিকেট নিয়ে।

এই বিষয়গুলো সবাই নিয়ে কথা বলে। আমিও বললাম।


বাড়ি ফিরে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি সবার মতো?”

“মানে?”

“মানে… তুমি কি অন্য বাবাদের মতো?”

“জানি না। কেন?”

“এমনি।”

সে চলে গেল।

আমি বসে রইলাম।


পরদিন অফিসে গিয়ে দেখলাম সবাই কম্পিউটারে তাকিয়ে আছে।

আমিও তাকালাম।

সবাই চা খাচ্ছে।

আমিও চা আনলাম।

বস ঢুকলেন। সবাই একটু সোজা হয়ে বসল।

আমিও বসলাম।

মিটিংয়ে সবাই মাথা নাড়ল।

আমিও নাড়লাম।

বাথরুমে গিয়ে আয়নায় তাকালাম।

ভাবলাম, এইমাত্র আমি কতবার অন্যদের দেখে কিছু করলাম?

গুনতে পারলাম না।


সেই রাতে হ্যাপিকে বললাম, “আমি কি স্বাভাবিক?”

“মানে?”

“মানে… আমি কি অন্যদের মতো?”

সে ভাবল।

“তুমি তো তুমি।”

“সেটা উত্তর না।”

“তুমি অদ্ভুত প্রশ্ন করো।”

“করি।”

“এটাই তোমার স্বভাব।”

“কোনটা? অদ্ভুত প্রশ্ন করা?”

“হ্যাঁ।”

“সেটা কি স্বাভাবিক?”

সে হাসল।

“ঘুমাও।”


পরদিন বাসে উঠলাম।

সবাই জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি তাকালাম না। সামনে তাকালাম।

কেউ খেয়াল করল না।

অফিসে সবাই চা খাচ্ছে।

আমি খেলাম না।

কেউ কিছু বলল না।

মিটিংয়ে সবাই মাথা নাড়ল।

আমি নাড়লাম না। শুধু শুনলাম।

কেউ লক্ষ করল না।


বাড়ি ফিরে আরাশ বলল, “বাবা, আজকে তুমি অন্যরকম।”

“কীরকম?”

“জানি না। অন্যরকম।”

হ্যাপিও তাকাল।

“সত্যিই। কিছু হয়েছে?”

“না।”

“তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।”

“কিছু হয়নি। শুধু…”

“শুধু?”

“শুধু আজ সবার মতো করিনি।”

তারা দুজনে চুপ করে রইল।

আমিও।


সেই রাতে বারান্দায় বসলাম।

ভাবলাম, স্বাভাবিক মানে কী?

সবাই যা করে তা করা?

সবাই যা বলে তা বলা?

নাকি স্বাভাবিক বলে কিছু নেই?


পরদিন সকালে আয়নায় তাকালাম।

শেভ করছি।

আরাশ এলো।

“বাবা।”

“হুম।”

“তুমি কি জানো তুমি কেমন?”

“কেমন মানে?”

“মানে… তুমি কি জানো তুমি কী করো?”

ব্লেড থামালাম।

“জানি না।”

সে একটু ভাবল।

“আমিও জানি না আমি কেমন।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ। মাঝে মাঝে আমি বন্ধুদের দেখে কিছু করি। তারপর ভাবি, এটা কি আমি করতে চেয়েছিলাম?”

তার দিকে তাকালাম।

“তুমি তো ছোট।”

“ছোট হলে কি ভাবা যায় না?”

কিছু বললাম না।

সে চলে গেল।

আমি আয়নায় তাকিয়ে রইলাম।

ফোম শুকিয়ে যাচ্ছে।

বাইরে বাসের হর্ন। মানুষ অফিসে যাচ্ছে।

আমিও যাব।

কিন্তু আজ হয়তো একটু অন্যভাবে।

হয়তো না।

জানি না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

কথা

দুই মুখ

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

কথা

ভণ্ড

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

কথা

স্যার

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *