“বাবা, পানি কীভাবে বাতাস হয়ে যায়?”
আরাশের প্রশ্নে আমি থমকে গেলাম। আমি জানি এটার উত্তর আছে। কিন্তু সেটা কী?
“মানে… পানি গরম হলে বাতাস হয়ে যায়।”
“কিন্তু কেন? পানি তো পানিই থাকার কথা।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি জানি না কেন।
“এটা… এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম।”
আরাশের মুখে হতাশা। সে বুঝে গেছে আমি উত্তর জানি না।
এগারো বছরের ছেলের কাছে আমি—একজন লেখক, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ—নিরুত্তর।
আমি বুঝতে পারছি আরাশ আমাকে নিয়ে হতাশ। তার বাবা সবকিছু জানার কথা। কিন্তু তার বাবা জানে না পানি কীভাবে বাষ্প হয়।
“বাবা, তুমি তো সব জানো। তাহলে এইটা জানো না কেন?”
আমার বুকে তীর বিঁধল। আরাশ ঠিক বলেছে। আমি তার কাছে এক সর্বজ্ঞ মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আজ সে আবিষ্কার করল আমার অজ্ঞতা।
“আরাশ, বাবারা সবকিছু জানে না। আমিও জানি না।”
কিন্তু এই স্বীকারোক্তি আরাশের মনে আরো প্রশ্ন তুলল।
“তাহলে তুমি কী জানো?”
আমি কী জানি? আমি কবিতা লিখতে জানি। কিন্তু কবিতা দিয়ে পানির বাষ্পীভবন ব্যাখ্যা করা যায় না।
আমি রাজনীতি নিয়ে মতামত দিতে পারি। কিন্তু আরাশের কৌতূহলী মনের কোনো কাজে আসে না।
আমি অনুভূতি নিয়ে লিখতে পারি। কিন্তু বিজ্ঞানের সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না।
আমি একটা অসম্পূর্ণ বাবা।
আমার মনে পড়ল আমি যখন ছোট ছিলাম, আমিও আমার বাবাকে এমন প্রশ্ন করতাম। তিনিও অনেক সময় উত্তর দিতে পারতেন না। তখন তিনি রেগে যেতেন। বলতেন, “এতো প্রশ্ন করিস কেন?”
কিন্তু আমি রাগ করতে পারি না। আরাশের কৌতূহল একটা সুন্দর জিনিস। আমার উচিত সেই কৌতূহল মেটানো।
“আরাশ, চল আমরা দুজনে মিলে এর উত্তর খুঁজি।”
আরাশের চোখে আশার আলো। “কীভাবে?”
“ইন্টারনেটে দেখি। বই পড়ি।”
আমি বুঝলাম, বাবা হওয়া মানে সবকিছু জানা নয়। বাবা হওয়া মানে সন্তানের সাথে মিলে শেখা।
আমার শেখার আগ্রহ আরাশের চেয়ে কম হলে চলবে না। আমাকে আবার ছাত্র হতে হবে।
আমার ছেলের কাছে।
সেদিন আমরা দুজনে বসে পানির বাষ্পীভবন নিয়ে পড়লাম। আরাশ যতটা শিখল, আমিও ততটাই শিখলাম।
আমি বুঝলাম, জ্ঞানী বাবা হওয়ার চেয়ে শিক্ষার্থী বাবা হওয়া ভালো।
একটু ভাবনা রেখে যান