কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে হঠাৎ অদ্ভুত লাগল। কর্মচারী আমার কাছে একের পর এক কাগজ চাইছে আমি যে আছি সেটা প্রমাণ করতে। জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, সাক্ষীর স্বাক্ষর। যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটাই যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে আমি আছি।
আমি তো এখানে দাঁড়িয়ে আছি। শ্বাস নিচ্ছি। কথা বলছি। তাহলে আর কী প্রমাণ লাগে?
কর্মচারী বলল, “জন্মসনদ দেখান।” আমি দিলাম। সে বলল, “এটা দিয়ে প্রমাণ হয় আপনি জন্মেছেন। কিন্তু এখনো আছেন কিনা সেটার প্রমাণ চাই।”
আমি বললাম, “আমি তো এখানে দাঁড়িয়ে আছি।” সে বলল, “সেটা আমি দেখছি। কিন্তু কাগজে প্রমাণ চাই।”
তারপর চাইল জাতীয় পরিচয়পত্র। সেটা দেখে বলল, “এটা দিয়ে প্রমাণ হয় আপনার একটা নম্বর আছে। কিন্তু আপনি যে সেই ব্যক্তি সেটার প্রমাণ চাই।”
আমি বললাম, “ছবি তো আছে।” সে বলল, “ছবি যে কেউ লাগাতে পারে। আরও প্রমাণ চাই।”
তারপর চাইল ইউটিলিটি বিল। সেটা দেখে বলল, “এটা দিয়ে প্রমাণ হয় আপনি কোথাও থাকেন। কিন্তু আপনি যে জীবিত আছেন সেটার প্রমাণ চাই।”
আমি বললাম, “আমি তো কথা বলছি।” সে বলল, “কথা বলা যথেষ্ট না। লাইভিং সার্টিফিকেট চাই।”
লাইভিং সার্টিফিকেট! আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে আমি বেঁচে আছি। নিজের অস্তিত্বের প্রমাণপত্র।
তারপর চাইল সাক্ষী। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কীসের সাক্ষী?” সে বলল, “যে আপনি সত্যিই আপনি।”
আমি ভাবলাম, আমি ছাড়া আর কে হতে পারি?
হ্যাপিকে ফোন করে সাক্ষী হতে বললাম। সে এসে বলল, “হ্যাঁ, এই হায়দার।” কর্মচারী বলল, “আপনি কীভাবে নিশ্চিত?” হ্যাপি অবাক হয়ে বলল, “আমার স্বামী যে। পনের বছরের চিনি।”
কর্মচারী বলল, “সেটাও প্রমাণ করতে হবে। বিবাহ সনদ আনুন।”
আরাশকে নিয়ে এলাম। বললাম, “এই আমার ছেলে।” কর্মচারী বলল, “প্রমাণ কী?” আমি জন্মসনদ দেখালাম। সে বলল, “এতে শুধু লেখা আছে আপনি বাবা। কিন্তু আপনি যে সেই বাবা সেটার প্রমাণ নেই।”
আমি বুঝতে পারলাম, এই সমাজে আমার অস্তিত্বের কোনো স্বতন্ত্র মূল্য নেই। আমাকে প্রমাণ করতে হবে কাগজ দিয়ে।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, তুমি তো দেখ আমি আছি। তোমার কাছে কি আমার কোনো কাগজপত্র লাগে?”
কিন্তু এই পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষ্যও যথেষ্ট নয়। চাই কাগজের প্রমাণ।
আমি একটার পর একটা কাগজ জোগাড় করলাম। জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইউটিলিটি বিল, বিবাহ সনদ, চাকরির সনদ, শিক্ষার সনদ, আয় সনদ, লাইভিং সার্টিফিকেট।
কিন্তু তারপরও কর্মচারী বলল, “আরও কিছু লাগবে। আপনার পরিচয় সত্যায়ন করাতে হবে।”
আমি বুঝলাম, এই প্রক্রিয়ার কোনো শেষ নেই। আমাকে সারাজীবন প্রমাণ করতে হবে যে আমি আছি।
আর সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, এই সব প্রমাণের পরও কেউ আমাকে দেখে না। তারা দেখে আমার কাগজ।
আমি একগাদা কাগজের পেছনে হারিয়ে গেছি। আমার প্রকৃত অস্তিত্ব অদৃশ্য।
রাতে বাড়িতে ফিরে ভাবি, আগামীকাল আবার নতুন কোনো জায়গায় যেতে হবে। আবার প্রমাণ করতে হবে যে আমি আছি।
আর এভাবেই সারাজীবন কাগজের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকব।
একটু ভাবনা রেখে যান