গতকাল রাতে জ্বর ছিল। ১০২।
শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ মনে হল আমি ছাদ থেকে দেখছি।
বিছানায় একজন কাঁপছে। শরীর ভেজা। চোখ বন্ধ।
সে আমি।
কিন্তু যে দেখছে?
কয় সেকেন্ড মনে ছিল না আমি কে। কোনো নাম মনে ছিল না। কোনো বয়স। শুধু দেখছিলাম।
তারপর ভয় লাগল।
নামটা মনে পড়ল। বয়স মনে পড়ল। বিবাহিত। একটা ছেলে।
কিন্তু এগুলো কি আমি? নাকি শুধু তথ্য?
পাসপোর্টে যা লেখা থাকে।
ছোটবেলায় আয়নার সামনে দাঁড়াতাম।
বাবা তখন বেঁচে ছিল। ভয় পেতাম তাকে। দূরে থাকতাম।
কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হত আরেকজন আছে। যে ভয় পায় না।
একদিন ধরা পড়ল।
“কী করছিস?”
“কিছু না।”
“আয়নায় কী দেখছিস?”
“নিজেকে।”
“নিজেকে দেখে কী হবে?”
মুখ ফিরিয়ে নিলাম। উত্তর ছিল না।
এখনো নেই।
বারান্দায় বসে আছি। নিচে রাস্তায় মানুষ।
একজন রিকশা চালাচ্ছে। একজন হাঁটছে। একজন দাঁড়িয়ে মোবাইল দেখছে।
সবাই চলছে। কোথায়? তারা জানে?
আমিও চলছি। কোথায়?
কিন্তু যে প্রশ্ন করছে, সে কে? সে তো চলছে না। সে দাঁড়িয়ে আছে। দেখছে।
তাহলে দুজন আছি?
একজন চলছে। একজন দেখছে।
কোনটা আমি?
স্ত্রী চা বানিয়ে দিল।
আগে চা খেতাম না। এখন খাই।
মানে আমি বদলেছি।
কিন্তু যে বদলেছে, সে তো আমি।
তাহলে আগের কে ছিল?
মরে গেল? নাকি কখনো ছিল না?
“কী ভাবছ?”
“চা।”
“চা নিয়ে কী ভাবার আছে?”
“আগে খেতাম না। এখন খাই।”
“তো?”
“মানে আমি আর আগের মতো নেই।”
সে হাসল। “পাগল হয়ে যাচ্ছ।”
হাসলাম। কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে গেল।
মায়ের শেষ দিনের কথা মনে পড়ল।
২০১৭। জানুয়ারি। হাসপাতাল।
মা শুয়ে ছিলেন। চোখ বন্ধ। শ্বাস নিচ্ছিলেন। তারপর থেমে গেল।
স্ত্রী ডাকল আমাকে।
গেলাম। মায়ের হাত ধরলাম। ঠান্ডা।
শরীর আছে। কিন্তু মা নেই।
তাহলে মা কী ছিল? শরীর?
ডাক্তার এসে মাথা নাড়াল।
জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল — মা কোথায় গেল?
করিনি। সে জানে না। আমিও না।
নামাজের সময় সেজদায় যাই। মাথা মাটিতে লাগে।
কে সেজদা করছে?
শরীর? মন?
দোয়া করি। বলি — আমার চিন্তা ঠিক করে দাও।
কিন্তু “আমার” মানে কার? যে দোয়া করছে? নাকি যার জন্য দোয়া?
দুজন কি আলাদা?
ছেলে এসে বসল পাশে।
“বাবা, জন্ম মানে কী?”
“তোর কী মনে হয়?”
“জন্ম মানে মনে পড়া। আমার তো মনে নেই আমি জন্মেছিলাম।”
“তাহলে তুই কবে জন্মেছিস?”
“হয়তো যখন প্রথম মনে পড়ল আমি আছি।”
“কবে মনে পড়েছিল?”
“মনে নেই। কিন্তু এখন আছে।”
ছেলেকে প্রথম দেখার দিন মনে আছে।
নার্স নিয়ে এল। ছোট্ট। লাল। চোখ বন্ধ।
“নাও। ধরো।”
ভয় লাগল। এত ছোট।
ধরলাম। হালকা। প্রায় কিছুই না।
তাকালাম। হঠাৎ কাঁদলাম।
“কী হল?”
“মনে হচ্ছে আমার একটা অংশ।”
“তাই তো।”
“কিন্তু এ কোথা থেকে এল?”
“আমার ভেতর থেকে। তোমার ভেতর থেকে।”
“তাহলে এ কে? আমি? তুমি? নাকি নতুন কেউ?”
স্ত্রী হাসল। উত্তর দিল না।
একবার দাঁতের ডাক্তারে গিয়েছিলাম।
“একটু ঘুম দেব। ব্যথা লাগবে না।”
সুঁই ঢুকল। “উল্টো দিকে গুনো। দশ। নয়। আট।”
আট পর্যন্ত মনে আছে।
তারপর?
চোখ খুললাম। ডাক্তার বলল, “শেষ।”
“কতক্ষণ?”
“এক ঘণ্টা।”
এক ঘণ্টা কোথায় গেল? আমি কোথায় ছিলাম?
ছিলাম কি?
নাকি মরে গিয়েছিলাম? তারপর আবার জন্মেছি?
“আমি কি ছিলাম?”
ডাক্তার অদ্ভুত চোখে তাকাল। “কী বলছ?”
“ঘুমের মধ্যে। আমি কি ছিলাম?”
“ছিলে তো। অজ্ঞান ছিলে।”
“অজ্ঞান মানে?”
“মানে… তুমি জানতে না।”
“জানার জন্য কি থাকা লাগে?”
সে কিছু বলল না। বলল, “বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি — ঘুম কি মরা?
প্রতি রাতে মরি। প্রতি সকালে জন্মাই।
তাহলে আজকের আমি আর গতকালের আমি কি এক?
কে বলবে?
পাশে স্ত্রী ঘুমাচ্ছে।
সে কি আমাকে চেনে? নাকি একটা ছবি চেনে?
আমি নিজেও তো জানি না আমি কেমন।
অফিসে একরকম থাকি। বাসায় আরেকরকম। একা থাকলে অন্যরকম।
কোনটা আমি? সব? নাকি একটাও না?
স্ত্রী জেগে উঠল। “কী?”
“তুমি কি আমাকে চেনো?”
চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কী বলছ?”
“আমি জিজ্ঞেস করছি — তুমি কি আমাকে চেনো?”
আরও চুপ।
তারপর, “ভেবে দেখিনি।”
“এখন ভাবো।”
“কেন হঠাৎ?”
উত্তর দিলাম না।
সে উঠে বসল। তাকাল। বলল, “তুমি আমার স্বামী। ছেলের বাবা। লেখো। চা খাও। মাঝে মাঝে অদ্ভুত কথা বলো। এটুকু জানি।”
“আর?”
“আর কী জানতে চাও?”
“আমি কে?”
“সেটা তো তোমাকে জানতে হবে।”
“আমি জানি না।”
সে হাসল। “আমিও জানি না আমি কে। তাহলে সমস্যা কী?”
সমস্যা কিছু নেই হয়তো।
কিন্তু প্রশ্ন আছে।
আগে মানুষের ওপর রাগ হতো। কেউ খারাপ ব্যবহার করলে কষ্ট পেতাম।
এখন হয় না।
কারণ মনে হয় — মানুষ নিজেই জানে না সে কী করছে।
আমিও না।
আমরা সবাই হাঁটছি। থামলে ভয় লাগে।
কিন্তু কোথায় যাচ্ছি? কেউ জানে না।
বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়ালাম।
জন্মের দিন নাকি বৃষ্টি হয়েছিল। মা বলেছিল।
বিয়ের দিনও। স্ত্রী বলেছিল, “শুভ লক্ষণ।”
হয়তো মৃত্যুর দিনও হবে।
বৃষ্টি সব ধুয়ে দেয়।
প্রশ্নও ধুয়ে যায় কি?
আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
দেখলাম একজনকে।
বয়স হয়েছে। চুল কম। চোখে ক্লান্তি।
এই বর্ণনা কি সে?
নাকি শুধু বাইরে?
ভেতরে কে?
হয়তো কেউ নেই।
হয়তো শুধু ফাঁকা।
যেখানে প্রশ্ন জমা হয়।
ছেলে এসে দাঁড়াল পেছনে। আয়নায় দুজন।
“বাবা, তুমি কি তোমাকে চেনো?”
“না।”
“আমি তোমাকে চিনি।”
“কীভাবে?”
“তুমি বাবা।”
“আর?”
“আর কিছু জানতে হবে?”
হয়তো না।
হয়তো “বাবা” হওয়াটাই যথেষ্ট।
অন্তত তার কাছে।
নামাজের সময় দোয়া করি। বলি — তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হোক।
কিন্তু কার সাথে? যে দোয়া করছে তার? নাকি যার জন্য দোয়া তার?
দুজন কি এক?
সন্ধ্যা হয়ে এল। নিচে রাস্তায় মানুষ ফিরছে।
সবার ভেতরে ‘আমি’ আছে।
কেউ জানে না সেটা কী।
সবাই খোঁজে।
কেউ পায় না।
হয়তো পাওয়ার মতো কিছু নেই।
হয়তো খোঁজাটাই জীবন।
স্ত্রী ডাকছে। “চা খাবে?”
উঠলাম।
এই মুহূর্তে ‘আমি’ মানে — যে চা খাবে।
এইটুকুই।
চা নিলাম। চুমুক দিলাম।
গরম। মিষ্টি।
অনুভব করছি।
তাহলে আছি।
কে?
মুখ থেকে বের হল — “মনে হয় আমি কখনো জন্মাইনি।”
স্ত্রী তাকাল। “কী বললে?”
“মনে হয় আমি কখনো জন্মাইনি। শুধু মনে পড়েছে আমি আছি। ছেলে যেমন বলল।”
“তাহলে তুমি কী?”
চুপ করে রইলাম।
কী বলব? যে প্রশ্ন করছে, সে কে? যে উত্তর খুঁজছে, সে কে?
হয়তো প্রশ্ন করাটাই আমি।
হয়তো উত্তর খোঁজাটাই।
হয়তো এই “হয়তো”টাই।
রাত হয়েছে। শুতে যাব।
কাল সকালে উঠব। নতুন কেউ উঠবে।
আজকের আমি মরে যাবে।
প্রতিদিন মরি। প্রতিদিন জন্মাই।
কিন্তু যে দেখছে এই মরা আর জন্মানো, সে কে?
সে কি মরে? সে কি জন্মায়?
নাকি সে শুধু দেখে?
যদি দেখে, তাহলে সে কে?
আয়নার সামনে দাঁড়ালাম শেষবার।
তাকালাম।
একজন তাকিয়ে আছে।
কে সে?
মুখ খুলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
আমিও।
দুজন তাকিয়ে রইলাম।
কেউ কথা বলল না।
বাতি নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকার হয়ে গেল।
এখন আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু প্রশ্নটা আছে।
অন্ধকারে ভাসছে।
কে?
একটু ভাবনা রেখে যান