জীবন

আয়না

অক্টোবর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। দাঁত মাজছি।

হঠাৎ থামলাম। তাকালাম।

এই মুখটা কার?

চোখের নিচে দাগ। কপালে ভাঁজ। চুলে পাক।

চিনি। কিন্তু চিনি না।

হ্যাপি ডাকল। “চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

আয়না থেকে সরে এলাম।

গতকাল রাতে সাইফুল ফোন করেছিল। বিশ বছর পর। স্কুলের বন্ধু।

“কাল দেখা করবি? বাবুও আসবে।”

“আসব।”

কফি শপে গিয়েছিলাম। সাইফুল আর বাবু বসে ছিল।

সাইফুল আমাকে দেখে হাসল। “তুই তো একদমই পাল্টায়নি!”

পাল্টাইনি?

বসলাম। কফি অর্ডার করলাম।

বাবু বলল, “মনে আছে শেষ বেঞ্চে বসতাম? টিচার ধরতে পারত না।”

“হ্যাঁ।”

“টিফিনে মাঠে ফুটবল খেলতাম। তুই গোলকিপার ছিলিস।”

ছিলাম? আমি গোলকিপার ছিলাম?

মনে নেই। না, একটু মনে আছে। অনেক আগের কথা।

সাইফুল বলল, “আর মনে আছে ক্লাস টেনে তুই সেই মেয়েটার জন্য কবিতা লিখেছিলিস?”

হাসলাম। “মনে আছে।”

“এখন লিখিস?”

“না। অনেকদিন লিখিনি।”

“কেন?”

জানি না। কেন লিখি না?

বাসায় ফিরে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কেমন ছিল?”

“ভালো।”

“বন্ধুরা চিনতে পেরেছিল?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি কি ওদের চিনতে পেরেছ?”

ভালো প্রশ্ন। চিনতে পেরেছি?

“হ্যাঁ, চিনেছি। কিন্তু…”

“কিন্তু কী?”

“জানি না। অন্যরকম লাগছিল।”

হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি অনেক ভাবছ আজকাল।”

“তাই?”

“হ্যাঁ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকো। কিছু ভাবছ।”

ঠিক কথা। ভাবছি।

রাতে আরাশ বলল, “আব্বু, তুমি কি আগে কবিতা লিখতে?”

“হ্যাঁ। ছোটবেলায়।”

“এখন লিখো না কেন?”

“ভুলে গেছি।”

“কীভাবে ভুলে যায়?”

কীভাবে? জানি না।

“এখন আর মন চায় না।”

আরাশ ভাবল। তারপর বলল, “আব্বু, তুমি কি আগের মতো আছ?”

“মানে?”

“মানে তুমি তো তুমিই আছ। কিন্তু তুমি কি একই আছ?”

আমি তাকালাম। সাত বছরের বাচ্চা এই প্রশ্ন করছে।

“জানি না আরাশ। তুমি কী মনে করো?”

“আমি মনে করি তুমি একই। কারণ তোমার কণ্ঠস্বর একই। তোমার চোখ একই। তুমি আমাকে একই ভাবে ভালোবাসো।”

চুপ করে রইলাম। আরাশ ঘুমাতে চলে গেল।

কণ্ঠস্বর একই। চোখ একই। কিন্তু ভিতরে?

মনে পড়ল নানুর কথা। গত বছর মারা গেছেন।

শেষ দুই বছর কাউকে চিনতেন না। নিজের নামও ভুলে গিয়েছিলেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করতেন, “তুমি কে?”

কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজালে চোখ জ্বলে উঠত। হাত নাড়তেন তালে তালে।

আমরা পাশে বসলে শান্ত হয়ে যেতেন। হাত ধরতেন।

ভালো খাবার খেলে মুচকি হাসতেন।

স্মৃতি ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন।

তার মানে কি স্মৃতিই পরিচয় নয়?

সুলতানের কথা মনে পড়ল। গত বছর দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত লেগেছিল। হাসপাতালে গিয়েছিলাম দেখতে।

“তিন বছরের স্মৃতি চলে গেছে,” ডাক্তার বলেছিল। “মনে নেই কিছু।”

কিন্তু সুলতান আমাকে দেখে হেসেছিল। সেই একই হাসি। একই ভাবে কথা বলেছিল। রেগে গেলে একই ভাবে ভ্রু কুঁচকেছিল।

স্মৃতি নেই। কিন্তু সে আছে।

পরদিন অফিসে বসে এসব ভাবছিলাম। একজন সহকর্মী এল।

“কী ভাবছেন?”

“কিছু না।”

“দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা ভাবছেন। আপনাকে চিনি অনেকদিন। যখন কিছু নিয়ে ভাবেন, এমন মুখ করেন।”

আমাকে চেনে। আমার স্মৃতি থেকে না। আমার ভাব থেকে।

সন্ধ্যায় মা ফোন করল।

“কী করছিস?”

“কিছু না মা। এমনি বসে আছি।”

“তুই ছোটবেলা থেকেই এমন। কিছু একটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলে আর ছাড়িস না।”

“কী মনে আছে মা?”

“অনেক কিছু। ক্লাস ফাইভে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলি, আকাশ নীল কেন। আমি বললাম আল্লাহ এমন বানিয়েছেন। তুই রাগ করলি। লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়লি।”

হাসলাম। “মনে নেই মা।”

“তোর মনে নেই। আমার আছে। তুই এখনো তাই। প্রশ্ন করতে ছাড়িস না।”

ফোন রাখলাম।

মা আমাকে চেনে ৩৯ বছর ধরে। আমার সব পরিবর্তন দেখেছে। কিন্তু তার কাছে আমি একই।

কিন্তু আমার কাছে?

রাতে ছাদে উঠলাম। আকাশ দেখছি। তারা আছে।

ছোটবেলায় এভাবেই দাঁড়াতাম। ভাবতাম তারাগুলো কত দূরে।

এখন ভাবছি আমি কত দূরে। নিজের থেকে।

হ্যাপি এল ছাদে। পাশে দাঁড়াল।

“কী ভাবছ?”

“ভাবছি… আমি যদি সব ভুলে যাই, তাহলে আমি কি আমি থাকব?”

হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “থাকবে।”

“কীভাবে জানো?”

“জানি। তুমি সব ভুলে গেলেও তুমি আমার হাত ধরবে। আরাশকে ভালোবাসবে। সুন্দর কিছু দেখে থমকে দাঁড়াবে।”

“এটাই কি আমার পরিচয়?”

“জানি না। হয়তো।”

আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

হ্যাপি বলল, “মনে আছে প্রথম দেখা হয়েছিল কোথায়?”

“হ্যাঁ। বইমেলায়।”

“তুমি একটা বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলে। অনেকক্ষণ ধরে। যেন পৃথিবীতে আর কিছু নেই।”

“তুমি এগুলো মনে রাখো?”

“হ্যাঁ। ওইদিন ভেবেছিলাম, এই ছেলে আলাদা।”

“এখন?”

“এখনো তাই মনে হয়। তুমি এখনো সেই ছেলে যে বইয়ের পাতায় হারিয়ে যায়।”

কিন্তু আমি তো পাল্টে গেছি। তাই না?

হ্যাপি ভিতরে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

মনে পড়ল ছোটবেলার একটা খেলা। “আমি কে?” খেলা। একজন চোখ বেঁধে থাকত। বাকিরা ঘুরত চারপাশে। সে হাত দিয়ে ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করত, “আমি কে?”

খেলায় উত্তর ছিল। ছুঁয়ে বোঝা যেত।

জীবনে?

ভিতরে ফিরে এলাম। আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।

তাকালাম। এই মুখ। এই চোখ। এই মানুষ।

কে এই মানুষ?

সেই ছেলে যে বৃষ্টিতে কাগজের নৌকা ভাসাত?

সেই কিশোর যে ছাদে দাঁড়িয়ে তারা গুনত?

সেই যুবক যে কবিতা লিখত?

এই মানুষ যে এখন দাঁড়িয়ে আছে?

সবাই? কেউ না?

আরাশ ডাকল। “আব্বু, আমার জল দাও।”

জল নিয়ে গেলাম। দিলাম।

“আব্বু, তুমি কি আমার আব্বু ছিলে যখন তুমি ছোট ছিলে?”

“না। তখন তুমি ছিলে না।”

“তাহলে তুমি কী ছিলে?”

“আমি ছিলাম আমার মায়ের ছেলে।”

“এখন?”

“এখন তোমার আব্বু।”

“আর কাল?”

কাল? কাল কে থাকব?

“জানি না আরাশ।”

আরাশ ঘুমিয়ে পড়ল। আমি জানালায় দাঁড়ালাম।

হয়তো প্রতিদিন একটু একটু করে পাল্টাচ্ছি। হয়তো প্রতিটা মুহূর্তে নতুন হচ্ছি।

হয়তো কোনো স্থির পরিচয় নেই। হয়তো আছে।

জানি না।

বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করলাম।

“আমি কে?” — খেলার কথা মনে এল।

চোখ বেঁধে দাঁড়িয়ে আছি। হাত দিয়ে ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করছি, “আমি কে?”

কিন্তু এখানে কেউ নেই উত্তর দিতে।

শুধু প্রশ্ন আছে। ঘুরছে চারপাশে।

আমি কে? আমি কে? আমি কে?

হয়তো উত্তর নেই। হয়তো উত্তর খুঁজতে হয় না।

হয়তো প্রশ্নই যথেষ্ট।

হয়তো না।

জানি না।

ঘুম এল। চোখ ভারী হয়ে এল।

কাল সকালে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াব। তাকাব।

সেই মুখ দেখব। হয়তো চিনব। হয়তো চিনব না।

হয়তো জিজ্ঞেস করব, “তুমি কে?”

হয়তো উত্তর আসবে। হয়তো আসবে না।

জানি না।

আত্মউপলব্ধি জীবনবোধ নিজেকে-খুঁজে-পাওয়া মননশীলতা স্মৃতি-রোমন্থন

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

দাগ

ডিসেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *