ব্লেড ধরেছি। হাত থেমে গেল।
আয়নায় একজন আছে। চোখদুটো চেনা মনে হয় না। দাড়ির ভেতর মুখ লুকিয়ে আছে।
কামাতে শুরু করলাম। ফেনা মুছে গেল। একটা মুখ বেরিয়ে এল। এটা কে?
রেজার রেখে দিলাম।
সকাল সাতটা। আরাশ স্কুলের ব্যাগ নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে।
“বাবা, তুমি কে?”
“মানে?”
“তুমি তো আমার বাবা। কিন্তু তুমি নিজে কে?”
কী বলব জানি না।
“স্কুলে যাও। দেরি হবে।”
আরাশ বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হলো।
রুমে ফিরে এলাম। হ্যাপি বিছানায় বসে ফোন দেখছে।
“কী হলো?”
“কিছু না।”
“মুখ দেখে মনে হচ্ছে না।”
চুপ করে রইলাম।
ছোটবেলার একটা রাত মনে পড়ে। সাত বছর বয়স।
জ্বর এসেছিল। মা পাশে বসে ছিল। ভেজা কাপড় কপালে দিচ্ছিল।
হাত তুলে দেখছিলাম। পাঁচটা আঙুল। নড়ছে। কার আঙুল?
“মা।”
“কী?”
“এই হাত কার?”
মা কপালে হাত দিল। “জ্বর বেড়ে গেছে মনে হয়।”
“না। আমি জিজ্ঞেস করছি। এই হাত কার?”
মা চুপ করে রইল।
ঘর ঘুরছিল। সিলিং ফ্যান নামছিল। মেঝে উঠে আসছিল।
সেই রাতের পর থেকে মাঝেমাঝে হাতের দিকে তাকাই। এখনও অচেনা লাগে।
২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে দিলাম।
অফিসের শেষ দিন বাবু এসেছিল। আমরা ক্যান্টিনে বসে চা খেলাম।
“কী করবে এখন?”
“জানি না।”
“ভয় লাগছে?”
“না। একটু হালকা লাগছে।”
“হালকা?”
“হ্যাঁ। যেন একটা ভারী কোট খুলে ফেলেছি।”
বাবু চুপ করে চা খেল। তারপর বলল, “তুমি অফিসে যেমন ছিলে, বাড়িতেও কি তেমন?”
“কেন?”
“জানি না। মনে হয় তুমি এখানে অন্যরকম ছিলে।”
বিকেলে বাড়ি ফিরলাম। হ্যাপি রান্না করছিল।
“কেমন লাগছে?”
“কিছু লাগছে না।”
“কাল থেকে কী করবে?”
“জানি না। ঘুমাব হয়তো।”
হ্যাপি হাসল। “সারাদিন?”
“হয়তো।”
রাতে ঘুম আসল না। ছাদে উঠলাম। শহরের আলো জ্বলছে। দূরে একটা কুকুর ডাকছে।
আমি কে? যে চাকরি করত সে? নাকি যে এখন ছাদে দাঁড়িয়ে আছে সে?
ফজরের আজান হলো।
উঠে ওযু করলাম। পানি ঠান্ডা। মুখে লাগল, হাত ধুলাম। পা ধুলাম।
নামাজে দাঁড়ালাম। সূরা পড়তে শুরু করলাম। হঠাৎ মনে হলো—কে দাঁড়িয়ে আছে?
সূরা থেমে গেল। মনে করতে পারছি না পরের আয়াত।
চোখ খুললাম। জানালা দিয়ে আলো আসছে। সকাল হচ্ছে।
সাইফুল ফোন করল।
“কী খবর?”
“ভালো।”
“মিথ্যা বলছ।”
“কী করে জানলে?”
“গলা শুনে।”
চুপ করে রইলাম।
“দেখা করব?”
“কবে?”
“এখন। আসছি।”
সাইফুল এল। আমরা বারান্দায় বসলাম।
“তুমি কীভাবে বুঝলে আমার গলা শুনে?”
“তুমি যখন ভালো থাকো, গলা অন্যরকম হয়। যখন না থাকো, আরেকরকম।”
“তুমি কি আমাকে চেনো?”
সাইফুল তাকাল। “মানে?”
“আমি বলতে কী বোঝ? তুমি যাকে চেনো, সে কি আমি?”
“এসব কী বলছ?”
“জানি না।”
সাইফুল সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া উড়ে গেল।
“তুমি তুমি। এর বেশি কিছু ভাবার দরকার নেই।”
“কিন্তু আমি জানি না আমি কে।”
“কেউ জানে না। সবাই ভান করে জানে।”
রাতে একটা পুরনো ডায়েরি পেলাম। ২০১৫ সালের।
একটা পাতা খুললাম। হাতের লেখা চেনা মনে হয় না।
“আজ অফিসে প্রমোশন হলো। খুশি লাগছে। মনে হচ্ছে জীবন এগিয়ে যাচ্ছে।”
আমি এটা লিখেছিলাম? এই শব্দগুলো আমার?
অন্য পাতা খুললাম।
“মা আজ খুব অসুস্থ। হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ভয় লাগছে।”
মা এখন নেই। যে ছেলে এটা লিখেছিল, সে কোথায় গেল?
ডায়েরি বন্ধ করে রাখলাম।
সুলতান এসেছিল। অনেকদিন পর দেখা।
“মনে আছে স্কুলে একসাথে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলাম?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি খুব চুপচাপ ছিলে। সবসময় জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে।”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ। ক্লাসে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তুমি উত্তর দিতে পারতে না। কিন্তু পরীক্ষায় তুমিই বেশি নম্বর পেতে।”
“মনে নেই।”
“কীভাবে মনে নেই?”
“জানি না। মনে হয় সেই ছেলে আমি ছিলাম না।”
সুলতান হাসল। “তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ।”
হয়তো।
আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি মাঝেমাঝে ভুলে যাও তুমি কে?”
“কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“আমার মাঝেমাঝে মনে হয়। স্কুলে থাকি, ভুলে যাই আমি কে। বাড়ি আসি, মনে পড়ে।”
“তোমার ভয় লাগে?”
“না। একটু অদ্ভুত লাগে।”
“আমারও লাগে।”
“তুমিও ভুলে যাও?”
“হ্যাঁ।”
আরাশ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে আমরা কি একই?”
“কী বলতে চাইছ?”
“তুমি আর আমি। আমরা দুজনই ভুলে যাই। তাহলে আমরা কি একই মানুষ?”
কী বলব জানি না।
এক রাতে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“কেন?”
“মনে হয় তুমি মাঝেমাঝে দূরে চলে যাও। শরীর এখানে থাকে, মন থাকে না।”
“জানি।”
“কোথায় যাও?”
“জানি না। খুঁজি।”
“কী খুঁজো?”
“নিজেকে।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “খুঁজে পেয়েছ?”
“না।”
“কখনো পাবে?”
“জানি না। হয়তো না।”
হ্যাপি হাত ধরল। “থামো। আর খুঁজো না।”
“কেন?”
“কারণ তুমি এখানে আছো। আমার সামনে। এটাই যথেষ্ট।”
কিন্তু যথেষ্ট কি?
রাত তিনটা। ঘুম ভেঙে গেল।
বাথরুমে গেলাম। আয়নায় তাকালাম।
একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
আলো জ্বালালাম।
মুখ দেখা গেল। চোখ লাল। চুল এলোমেলো।
হাত তুললাম। আয়নার লোকও তুলল।
হাসলাম। সেও হাসল।
কিন্তু হাসি চোখে পৌঁছাল না।
আলো নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সাত বছর আগে বাবা মারা গেল।
শেষবার দেখেছিলাম হাসপাতালে। চোখ বন্ধ ছিল। শ্বাস নিচ্ছিল।
হাত ধরেছিলাম। ঠান্ডা।
“বাবা।”
কোনো সাড়া নেই।
“আমি এসেছি।”
শ্বাস থেমে গেল। মনিটরে একটা লম্বা শব্দ হলো।
নার্স এল। ডাক্তার এল। সবাই কিছু করল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাবা চলে গেল। কে গেল? যে শরীর ছিল, সেটা তো আছে। তাহলে কী গেল?
বাইরে এলাম। বৃষ্টি হচ্ছিল। ভিজে গেলাম।
রিকশায় উঠলাম। বাড়ি ফিরলাম।
হ্যাপি দরজা খুলল। চোখ লাল।
কিছু বললাম না। ভেতরে ঢুকলাম। শুয়ে পড়লাম।
কাঁদলাম না। কাঁদতে পারলাম না।
যে কাঁদে, সে কে?
আজ সকালে আয়নায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
দাড়ি কামালাম। মুখ ধুলাম।
আয়নার লোক তাকিয়ে আছে।
আমি তাকালাম।
কে তুমি?
সে কিছু বলল না।
আমিও বললাম না।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
হ্যাপি রান্নাঘরে। আরাশ স্কুলে গেছে।
বারান্দায় দাঁড়ালাম। রোদ উঠছে।
এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে আছে টেবিলে। সকালে বানিয়েছিলাম। খাইনি।
এখন খাব?
হাত বাড়ালাম। থামলাম।
কার হাত?
জানি না। হয়তো কখনো জানব না।
রোদ উঠছে। পাখি ডাকছে। শহর জেগে উঠছে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি।
এটুকুই হয়তো সত্য।
একটু ভাবনা রেখে যান