গত মাসে আরাশের পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়েছিল। হ্যাপি বলেছিল, “পরের বার ভালো করবে।” আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ, আশা রাখতে হয়।” কিন্তু রাতে একা থাকতে থাকতে প্রশ্ন জাগল – এই আশা কি আমাদের সাহায্য করছে, নাকি আমাদের অন্ধ করে রাখছে? আরাশের যদি পড়াশোনায় প্রকৃতই সমস্যা থাকে, তাহলে আমরা কি সেটা মেনে নিয়ে অন্য পথ খুঁজব, নাকি আশার নামে চাপ দিতে থাকব?
জামিউরের ছেলে তিন বছর ধরে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। প্রতিবার ব্যর্থ হয়, প্রতিবার জামিউর বলে, “আগামী বার হবে।” গতকাল দেখা হলে সে বলল, “ভাই, ওর স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। আশা ছাড়া তো আর কিছু নেই।” কিন্তু আমি ভাবলাম – এই আশা কি তার ছেলেকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আটকে রাখছে?
সাইফুল কবিরের ব্যবসা গত দুই বছর ধরে লোকসানে চলছে। কিন্তু সে প্রতিদিন দোকানে বসে। “পরিস্থিতি ভালো হবে,” বলে। তার স্ত্রী বলেছিল অন্য কাজ খুঁজতে, কিন্তু সাইফুল বলেছে, “আশা হারালে তো হার মানা।” এই আশা কি তার পরিবারের জন্য ভালো, নাকি তারা বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন শুরু করলে ভালো হতো?
আমার নিজের কথা ভাবি। আমি কত বছর ধরে আশা করছি আমার চাকরিতে প্রমোশন হবে। কত বছর ধরে ভাবছি “এই বছর হবে।” এই আশা কি আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করছে, নাকি আমি বাস্তবতা মেনে নিয়ে অন্য পথ খোঁজা উচিত ছিল?
মৃদুল যখন কানাডায় চলে গেল, আমরা সবাই বলেছিলাম, “ভালো হবে।” কিন্তু মৃদুল এখন বলে, “ভাই, এখানে এসে বুঝেছি আমি যা আশা করেছিলাম সেটা বাস্তব ছিল না।” তার আশা কি তাকে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল, নাকি সে আশা না করলে চেষ্টাই করত না?
আমার মনে হয়, আশা আর বাস্তবতা – এই দুটোর মধ্যে একটা জটিল সম্পর্ক। আশা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু কখনো কখনো ভুল দিকে। বাস্তবতা আমাদের থামিয়ে দেয়, কিন্তু কখনো কখনো সঠিক পথে।
হ্যাপির মা মারা যাওয়ার পর ডাক্তাররা বলেছিলেন, “আশা রাখুন।” আমরা আশা রেখেছিলাম। কিন্তু যখন বুঝলাম তিনি সুস্থ হবেন না, তখন আমরা বাস্তবতা মেনে নিয়ে তার শেষ দিনগুলো সুন্দর করার চেষ্টা করেছিলাম। সেই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কি আশা হারানো ছিল, নাকি নতুন ধরনের আশা ছিল?
বাবা মারা যাওয়ার পর আমি আশা করেছিলাম পরিবারটা একসাথে থাকবে। কিন্তু ভাই আলাদা হয়ে গেল। আমি দীর্ঘদিন আশা করেছি সে ফিরে আসবে। কিন্তু যখন মেনে নিলাম যে এটাই বাস্তবতা, তখন আমি আমার নিজের পরিবারে মনোযোগ দিতে পারলাম।
আমার মনে হয়, আশা আর বাস্তবতা মেনে নেওয়া – এই দুটো বিপরীত নয়। আশা মানে ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় বিশ্বাস। বাস্তবতা মেনে নেওয়া মানে বর্তমানের পরিস্থিতি স্বীকার করা। দুটোই প্রয়োজন।
আরাশের পড়াশোনার ব্যাপারে আমি আশা রাখি সে উন্নতি করবে, কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিয়ে তার বিশেষ প্রয়োজনগুলোও দেখি। জামিউরের ছেলের জন্য আশা রাখি সে সফল হবে, কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিয়ে বলি ডাক্তার ছাড়াও অনেক ভালো পেশা আছে।
কিন্তু কখন আশা ছাড়তে হয়? কখন বাস্তবতা মেনে নিতে হয়? এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। কারণ আশা ছেড়ে দিলে মনে হয় হার মানলাম। আর বাস্তবতা মানতে অস্বীকার করলে মনে হয় স্বপ্নবাজ থেকে গেলাম।
হয়তো উত্তর হলো ভারসাম্য। আশা রাখা, কিন্তু নমনীয় আশা। যে আশা পথ বদলাতে পারে। বাস্তবতা মেনে নেওয়া, কিন্তু হতাশ না হওয়া। যে বাস্তবতা নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়।
আমার আশা হলো আরাশ সুখী হবে। কিন্তু আমি বাস্তবতা মেনে নিয়েছি যে সুখ মানে আমার মতো জীবন নাও হতে পারে। আমার আশা হলো হ্যাপির সাথে আমার সম্পর্ক আরো ভালো হবে। কিন্তু আমি বাস্তবতা মেনে নিয়েছি যে এজন্য আমাকেও পরিবর্তন হতে হবে।
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আশা আর বাস্তবতা মেনে নেওয়া – এই দুটো একে অপরের বিপরীত নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। আশা আমাদের স্বপ্ন দেয়, বাস্তবতা আমাদের পা মাটিতে রাখে। আশা আমাদের চলতে শেখায়, বাস্তবতা আমাদের দিক ঠিক করে দেয়।
হয়তো জীবনের কলা হলো জানা কখন কোনটা করতে হবে। কখন আশা নিয়ে লড়তে হবে, কখন বাস্তবতা মেনে নিয়ে অভিযোজন করতে হবে। এবং বোঝা যে দুটোরই নিজস্ব মূল্য ও স্থান আছে।
একটু ভাবনা রেখে যান