৩৯ বছর বয়স। গতকাল ছিলাম ২৫। আজ হঠাৎ ৩৯। এর মধ্যে কী হলো? কোথায় গেল ১৪ বছর?
মনে আছে, ২৫ বছর বয়সে ভাবতাম – ৪০ হলে আমি একটা established মানুষ হব। বড় ঘর, গাড়ি, ব্যাংকে টাকা। সবাই আমাকে respect করবে।
এখন ৩৯। আর মনে হচ্ছে – আমি একটা ফাঁদে পড়ে আছি।
সকালে উঠে একই রুটিন। দাঁত ব্রাশ, গোসল, নাস্তা, অফিস। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। রাতে খাওয়া, টিভি দেখা, ঘুম। পরদিন আবার একই।
এই রুটিনটা কবে শুরু হয়েছিল? কবে এটা এত শক্ত হয়ে গেল যে ভাঙা যায় না?
অফিসে বসে আছি। রিপোর্ট বানাচ্ছি। একই ধরনের রিপোর্ট। যা গত ১০ বছর ধরে বানাচ্ছি। কাল বানাব, পরশু বানাব। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত বানাব।
হঠাৎ মনে হয় – এটাই কি আমার জীবন? এই রিপোর্ট বানানোটাই কি আমার অস্তিত্বের মানে?
২৫ বছর বয়সে আমার একটা স্বপ্ন ছিল। মনে করতে পারি না সেটা কী ছিল। হয়তো লেখালেখি করার স্বপ্ন। হয়তো ব্যবসা করার। হয়তো ভ্রমণ করার।
এখন সেই স্বপ্নটা মনে করতে গেলে মনে হয় – সেটা অন্য কোনো মানুষের স্বপ্ন ছিল। যে মানুষটা আমার মতো দেখতে ছিল, কিন্তু আমি নই।
ব্যাংকে গিয়ে দেখি – আমার একাউন্টে কিছু টাকা আছে। বেশি না, কম ও না। মধ্যম। সব কিছুই মধ্যম।
মধ্যবিত্ত বাড়ি, মধ্যবিত্ত গাড়ি, মধ্যবিত্ত জীবন। কোনো কিছুতেই আমি এক্সট্রিম নই। খুব ভালো ও না, খুব খারাপ ও না।
মাঝে মাঝে ভাবি – যদি আমি মারা যাই আজকে, কী থেকে যাবে? আমার অফিসে একজন নতুন লোক আসবে। আমার টেবিলে বসবে। আমার রিপোর্ট বানাবে।
কেউ হয়তো বলবে, “হায়দার একজন ভালো মানুষ ছিল।” কিন্তু কেন ভালো ছিল? কী করেছিল যেটা মনে রাখার মতো?
ঘরে ফিরে হ্যাপিকে দেখি। ১৫ বছর একসাথে। সে আমাকে জানে। কিন্তু আমি কি তাকে জানি? সে কি আমাকে জানে?
আমরা কথা বলি রোজকার বিষয় নিয়ে। আজ কী রান্না হবে, বিল কত, আরাশের স্কুলে কী হলো। কিন্তু আমরা কি কথা বলি আমাদের নিয়ে?
আমি কি জানি হ্যাপি কী স্বপ্ন দেখে? সেও কি জানে আমি কী চাই?
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি – এই যে জীবন কেটে যাচ্ছে, এটা কি সত্যিই আমার জীবন? নাকি আমি অন্য কারো জীবন বাঁচছি?
মাঝে মাঝে মনে হয় – আমার বয়স এখনো ২৫। কিন্তু আমি একটা ৩৯ বছরের মানুষের কস্টিউম পরে আছি। এই কস্টিউমটা কীভাবে খুলব?
অথবা উল্টো। আমার বয়স ৩৯, কিন্তু আমি এখনো ২৫ বছরের মানুষের মতো ভাবি। এটাই সমস্যা।
ফেসবুকে পুরনো বন্ধুদের দেখি। কেউ বিদেশে, কেউ বড় ব্যবসা করছে, কেউ বিখ্যাত হয়েছে। আমি একা এই জায়গায় আটকে আছি।
কিন্তু তারাও কি খুশি? নাকি তারাও তাদের নিজের জায়গায় আটকে আছে?
হয়তো এটাই ৩৯ বছর বয়সের অর্থ। এটাই মধ্যবয়স। সামনে এগোনোর শক্তি নেই, পেছনে ফেরার পথ নেই।
আমি একটা ট্রেনে আছি। ট্রেনটা চলছে একটা নির্দিষ্ট পথে। আমার কোনো কন্ট্রোল নেই। যাত্রী হিসেবে বসে আছি।
কিন্তু আমি কবে এই ট্রেনে উঠেছিলাম? টিকিট কবে কিনেছিলাম? গন্তব্য কী?
মনে নেই।
হয়তো এই না মনে থাকাটাই সমস্যা। হয়তো আমার মনে রাখা উচিত ছিল – আমি কেন এই পথে হাঁটছি।
এখন আর পথ বদলানো যাবে কি না জানি না। কিন্তু অন্তত এটুকু জানি – আমি আটকে আছি।
আর এই আটকে থাকাটা স্বীকার করাই হয়তো মুক্তির প্রথম ধাপ।
একটু ভাবনা রেখে যান