A man's dissolving reflection in a mirror symbolizing the fluid and illusory nature of the human self.

জীবন

‘আমি’ কি শুধুই একটি গল্প? এক মহাজাগতিক মিথ্যা

অক্টোবর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার
A man's dissolving reflection in a mirror symbolizing the fluid and illusory nature of the human self.
সত্যিটা হলো — কোনো স্থির কেন্দ্র নেই। কোনো অপরিবর্তিত সত্তা নেই। শুধু এই মুহূর্ত আছে, এই শ্বাস আছে, এই চিন্তা আছে। ‘আমি’ নেই, শুধু চলা আছে।

ডায়েরি খুলে এক বছর আগের লেখা পড়লে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। কেউ লিখেছে “আজ খুব খুশি।” কিন্তু সেই খুশির কথা মনে নেই। সেই মুহূর্তের কথা মনে নেই। এবং সবচেয়ে ভয়ের প্রশ্নটা হলো — যে লিখেছিল, সে কি আসলে এই মানুষটাই ছিল?

আমি” শব্দটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা। এবং এই মিথ্যাটা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে বলা হয়।

“আমি” আসলে একটা গল্প। মন নিজেই এই গল্পটা তৈরি করে, নিজেই বিশ্বাস করে, এবং সারাজীবন এই বিশ্বাস আঁকড়ে থাকে। কারণ যদি “আমি” না থাকে, তাহলে ভয় লাগে। শূন্যতা লাগে। তখন প্রশ্ন আসে — তাহলে কে আছে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস বেশিরভাগ মানুষের নেই।

শরীরের প্রতিটা কোষ বদলায়। প্রতিটা চিন্তা বদলায়। গতকাল যা ভালো লাগত, আজ লাগে না। দশ বছর আগে যা বিশ্বাস করা হতো, এখন হাসি পায়। পুরনো ছবিতে যে হাসছে, সেই হাসি আর আসে না। কিন্তু তবুও বলা হয় — “এটা আমি।” এই “আমি” আসলে একটা মৃত মানুষের ছবি। যে ছিল। এখন নেই।

নদীর নাম পদ্মা। কিন্তু পদ্মার পানি প্রতি সেকেন্ডে বদলায়। তাহলে “পদ্মা” কী? শুধু একটা নাম। একটা ধারণা। কোনো স্থির জিনিস না। মানুষও ঠিক তাই। নাম আছে, পরিচয় আছে, কিন্তু যাকে সেই নামে ডাকা হচ্ছে সে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে। পাল্টানো বললে ভুল হয় — আসলে প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে, প্রতিদিন জন্ম হচ্ছে।

স্মৃতি এই মিথ্যাটাকে টিকিয়ে রাখে। গতকালের কথা মনে আছে, তাই মনে হয় একই মানুষ। কিন্তু স্মৃতি নিজেও বদলায়। যা মনে আছে বলে ভাবা হয়, তা আসলে মনের বানানো একটা সংস্করণ — সত্যিকারের ঘটনা না। তাহলে সেই সংযোগটুকুও মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে।

ঘুম হলো এই সত্যের সবচেয়ে সহজ প্রমাণ। রাতে যে ঘুমায়, চেতনা বন্ধ হলে সে থাকে না। সকালে চোখ খোলে — কে খোলে? স্মৃতি আছে বলে বলা হয় “আমি।” কিন্তু স্মৃতি থাকলেই কি একই মানুষ? কম্পিউটারে পুরনো ডেটা থাকলে সেটা কি আগের কম্পিউটার হয়? না।

সমাজ চায় এই বিশ্বাসটা টিকে থাকুক। কারণ “আমি একই” না থাকলে দায়িত্ব থাকে না, পরিচয় থাকে না, হিসাব থাকে না। তাই সমাজ জোর করে একটা স্থির পরিচয় তৈরি করে দেয়। এবং মানুষ সেই পরিচয় বহন করতে করতে ভুলে যায় যে এটা আসলে একটা ভার, সত্য না।

সত্যিটা হলো — কোনো স্থির কেন্দ্র নেই। কোনো অপরিবর্তিত সত্তা নেই। শুধু এই মুহূর্ত আছে, এই শ্বাস আছে, এই চিন্তা আছে। “আমি” নেই, শুধু চলা আছে। নদী নেই, শুধু পানি চলছে

এবং এটা বুঝলে যা হয় সেটা ভয়ের না — সেটা মুক্তি। কারণ “আমি”ই সব সমস্যার জায়গা। “আমি” ভয় পায়, “আমি” অপমান বোধ করে, “আমি” মরার কথা ভেবে কাঁপে। কিন্তু যদি “আমি” না থাকে, তাহলে এই সবকিছু কার?

আয়নায় একটা মুখ দেখা যায়। এই মুহূর্তের। পরের মুহূর্তে এটা আর থাকবে না।

“আমি” একটা স্বপ্ন। এবং স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠাই শুরু।

আত্মআবিষ্কার আত্মপরিচয় আত্মপরিচয়ের সংকট জীবনের অভিজ্ঞতা মনোবিজ্ঞান

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

শার্ট

অক্টোবর ২০২৫ · 12 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *