বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।
নিচে রিকশাওয়ালা ঘাম মুছছে। গেঞ্জি শরীরে লেপ্টে আছে। সে তাকাল উপরে। আমিও তাকিয়ে আছি।
কিন্তু হাতটা এভাবে রাখলাম। মুখটা এভাবে করলাম। যেন মনে হয় আমি অলস।
এটা কি আমি? নাকি দেখাচ্ছি?
জানি না।
অনেকদিন ধরে এই খেলা খেলছি। এখন আর বুঝতে পারি না কোনটা আমি, কোনটা দেখানো।
ছেলে এসে দাঁড়াল পাশে। বলল, “বাবা, আয়নায় যাকে দেখি, সে কি আমি?”
বললাম, “হ্যাঁ।”
মিথ্যা বললাম। কিন্তু কী বলব? যে সত্যটা আমি নিজেই জানি না?
সে বলল, “আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় সে আমার ভাই। উল্টো পৃথিবীতে থাকে। আমি ডান হাত তুলি, সে বাম তোলে।”
থমকে গেলাম।
শিশুরা জানে। তারপর আমরা ভুলিয়ে দিই। শেখাই — তুমি একজন। এক নাম। এক পরিচয়।
স্ত্রী চা নিয়ে এল। হাত কাঁপছিল একটু। কাপে ছোট ঢেউ।
বলল, “তোমার চোখ দেখে মনে হয় তুমি আবার সেই জায়গায় চলে গেছ।”
“কোথায়?”
“যেখানে আমি পৌঁছাই না। যেখানে তুমি একা। সম্পূর্ণ একা। নিজের থেকেও আলাদা।”
তার দিকে তাকালাম। পনেরো বছর বিয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হল অপরিচিত।
না, পরিচিত। কিন্তু কাকে চিনি আমি? তাকে? নাকি আমার বানানো তাকে?
বললাম, “জানো, মাঝে মাঝে মনে হয় আমি তোমাকে বিয়ে করিনি।”
চুপ করে তাকাল।
“আমি বিয়ে করেছি একজনকে যে মায়ের দেখাশোনা করবে। যে আমার একা লাগা কমাবে। একটা আয়না যেখানে দেখব আমি বুড়ো হচ্ছি কি না।”
সে হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কষ্ট ছিল।
বলল, “আর আমি? আমি কাকে বিয়ে করেছি? যে স্বপ্ন দেখত? নাকি যে মরে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে?”
উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ জানি না। কোনটা আমি? স্বপ্ন দেখা? নাকি মরে যাওয়া?
হয়তো দুটোই। হয়তো কিছুই না।
মায়ের কথা মনে পড়ল।
মৃত্যুশয্যায় শুয়ে ছিলেন। তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। একদিন বললেন, “তুমি কে?”
“আমি তোমার ছেলে, মা।”
“না। তুমি মুখোশ পরে আছ। আমার ছেলের মুখোশ। তুমি আমার ছেলে না।”
“কী বলছ?”
“খোলো মুখোশ। তাকে দেখতে চাই।”
খুলতে পারিনি। জানি না কীভাবে খুলতে হয়।
নাকি জানি যে মুখোশের নিচে কিছু নেই?
সেই রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। খুঁজছিলাম সেই ছেলেকে যাকে মা চিনত।
পাইনি।
শুধু দেখেছি একটা মুখ। যা বদলায় প্রতি মুহূর্তে। কখনো দুঃখী। কখনো রাগী। কখনো ক্লান্ত। কখনো ফাঁকা।
কোনটা আমি? সব? নাকি একটাও না?
অফিসে যাই প্রতিদিন। সহকর্মী দেখলে হাসি। “কেমন আছ?”
ভেতরে ভাবি — এসব কিসের জন্য?
বাসায় ফিরি। স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, “দিন কেমন ছিল?”
“ভালো।”
মিথ্যা। কিন্তু বলি। কারণ সত্য বলতে ভয়।
সত্য হল — জানি না দিনটা কেমন ছিল। জানি না কোনটা আমি অনুভব করেছি, কোনটা দেখিয়েছি।
মুখোশ পরেছিলাম একদিন। এখন মুখোশই মুখ হয়ে গেছে।
বৃষ্টি হচ্ছে।
ছেলে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, বৃষ্টির ফোঁটা কি জানে সে বৃষ্টি?”
“তোর কী মনে হয়?”
“আমার মনে হয় না। বাতাসে থাকে, মনে করে সে সমুদ্র। মাটিতে পড়ে বোঝে — শুধু ফোঁটা।”
বুক ধক করে উঠল।
আমিও তাই হয়তো। বাতাসে ছিলাম। মনে করতাম সমুদ্র। এখন মাটিতে পড়েছি। বুঝেছি — শুধু ফোঁটা।
কিন্তু এটাও মিথ্যা হয়তো। আমি ফোঁটাও না। সমুদ্রও না। শুধু একটা ভাবনা। যা বদলায়।
নামাজ পড়ছি। সেজদায় গেছি।
কে সেজদা করছে? শরীর? মন? নাকি যে দেখাতে চায় সে ধার্মিক? নাকি যে সত্যি খুঁজছে?
জানি না।
এই না জানাটাই আমার জীবন।
লেখার টেবিলে বসেছি। কলম ধরেছি। কাগজ সাদা।
লিখলাম: “আমি সুখী।”
কেটে দিলাম।
লিখলাম: “আমি জানি না আমি সুখী কি না।”
কাটলাম।
লিখলাম: “সুখ মানে কী?”
কাটলাম।
স্ত্রী পেছন থেকে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, “এটাই সত্যি? তুমি জানো না তুমি সুখী কি না?”
ঘুরে তাকালাম। তার চোখে জল।
বললাম, “জানি না। হয়তো সুখ মানে দেখানো। আমরা দেখাই। তারপর বিশ্বাস করি।”
সে আমার হাত ধরল। বলল, “তাহলে একসাথে দেখাই।”
এই কথাটাও মুখোশ।
আমরা দুজনেই জানি। কিন্তু কেউ বলি না। কারণ বললে ভেঙে পড়বে।
তাই দেখাই। সুখের। ভালোবাসার। একসাথে থাকার। দেখাতে দেখাতে ভুলে যাই কোনটা সত্যি।
আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
দেখলাম একজনকে। কে সে?
স্বামী। বাবা। চাকরিজীবী। লেখক হতে চাই।
এই পরিচয়গুলো কি আমি? না। এগুলো মুখোশ।
আমি কে?
জানি না। কখনো জেনেছি? না। কখনো জানব? হয়তো না।
কারণ হয়তো “আমি” বলে কিছু নেই। শুধু মুখোশের স্তূপ। একটার পর একটা।
সব খুলব? তারপর কী? তারপর ফাঁকা। কিছু নেই।
এই ভয়েই মুখোশ পরি। কারণ ফাঁকা দেখতে ভয়।
ছেলে বলল, “বাবা, আমরা কি তিনজন?”
“কেন?”
“তুমি। আয়নার তুমি। আর যে আমাদের দুজনকে দেখছে।”
চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“হয়তো,” বললাম।
“তাহলে কোনটা সত্যি?”
“জানি না। হয়তো সব। হয়তো কিছু না।”
“তাহলে কী করব?”
“দেখব। শুধু দেখব।”
রাতে বিছানায় শুয়ে আছি। স্ত্রী পাশে।
বলল, “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”
“কাকে?”
“আমাকে।”
“আমি কি তোমাকে চিনি?”
“পনেরো বছর ধরে আছ। চেনো না?”
“জানি না। হয়তো আমি যাকে ভালোবাসি, সে তুমি না। আমার বানানো তুমি।”
চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে সেই আমাকেই ভালোবাসো। আমি আপত্তি করব না।”
“কেন?”
“কারণ সেও তো আমি। যদি তোমার মনে থাকে।”
জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। তারা আছে। মেঘ নেই।
ভাবছি — তারারা কি জানে তারা তারা? নাকি মনে করে তারা একা?
আমিও তাই হয়তো। মনে করি আমি একা। কিন্তু হয়তো অনেক আমি আছে।
আয়নায়। মানুষের মনে। আল্লাহর চোখে।
কোনটা সত্যি? জানি না। হয়তো সব। হয়তো কিছু না।
চোখ বন্ধ করলাম। ঘুম আসছে।
আজকের আমি চলে যাচ্ছে। কালকের আসবে।
সে কেমন হবে? আমার মতো? নাকি স্ত্রীর বানানো আমার মতো? নাকি ছেলের দেখা আমার মতো?
নাকি নতুন কেউ? নতুন মুখোশ?
জানি না। কিন্তু আসবে।
এইটুকু জানি। হয়তো।
বিকেলে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
নিচে শহর। মানুষ যাচ্ছে। আসছে। কথা বলছে। হাসছে।
সবাই মুখোশ পরে আছে।
অফিসের মুখোশ। বাসার মুখোশ। বন্ধুর মুখোশ। সফল মানুষের মুখোশ।
কেউ জানে না তার মুখোশের নিচে কী আছে। কিছু আছে কি না।
কেউ খোলে না। ভয় লাগে।
ভয় যদি দেখে — কিছু নেই।
তাই পরে থাকে। জীবনভর।
মুখোশ পরে জন্মায়। মুখোশ পরে মরে।
মাঝখানে কোথাও হয়তো একবার খোলার ইচ্ছা হয়। কিন্তু ততদিনে মুখোশ মুখ হয়ে গেছে।
খুললে মুখ উঠে আসবে।
তাই পরে থাকে।
আমিও।
রাত হয়েছে। বাতি জ্বালালাম না।
অন্ধকারে বসে আছি। আয়নার সামনে।
দেখা যাচ্ছে না কিছু। ভালোই আছে।
অন্ধকারে সব সমান। মুখোশ আর মুখ আলাদা করা যায় না।
হয়তো এই অন্ধকারই সত্যি।
আলো এলে মুখোশ পরতে হয়। অন্ধকারে পরার দরকার নেই।
কিন্তু সকাল হবে। আলো আসবে।
তখন আবার পরব।
যাকে চিনি, তাকে।
যাকে মানুষ চেনে, তাকে।
যাকে আমি নিজেও চিনি না, তাকে।
পরব। পরতেই হবে।
কারণ খোলার উপায় নেই।
নাকি আছে? জানি না।
হয়তো জানব না কখনো।
এভাবেই থাকব। মুখোশ পরে।
জীবনভর।
একটু ভাবনা রেখে যান