ব্লগ

আমলাতন্ত্রের জালে আটকে পড়া আত্মার গল্প

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতে পারলাম না। এই মানুষটা কে? যার চোখে একটা অদৃশ্য ক্লান্তি, কপালে বয়সের চেয়ে বেশি ভাঁজ, আর হাতে একটা ফাইলের দাগ। যেন সেই ফাইলটা আমার হাতের সাথে জন্মেছে। আমি জানি না কখন থেকে এই ফাইলটা আমার অংশ হয়ে গেছে।

গত পনের বছরে আমি কত অফিসে গেছি? গুনে শেষ করা যাবে না। কত কাউন্টারে দাঁড়িয়েছি? কত কেরানির মুখের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বলেছি, “স্যার, প্লিজ একটু দেখেন।” আর প্রতিবার একটুকরো আত্মা রেখে এসেছি সেই টেবিলে।

মনে আছে প্রথমবার চাকরির জন্য সার্টিফিকেট যাচাই করাতে গিয়েছিলাম। তখনো মনে হতো আমি একটা পূর্ণ মানুষ। আমার ইচ্ছা আছে, স্বপ্ন আছে, আবেগ আছে। কিন্তু সেদিন যখন কেরানি আমাকে নম্বর দিয়ে ডাকলেন – “৪৭ নম্বর” – তখন বুঝলাম আমি আর হায়দার নেই। আমি একটা নম্বর। একটা ফাইল। একটা কাগজের স্তূপ।

এরপর থেকে প্রতিটা অফিসে আমি আরেকটু কমে গেছি। প্রতিটা ফরমে আমার নাম লিখতে লিখতে মনে হয়েছে আমি শুধু একটা স্বাক্ষর। প্রতিটা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অনুভব করেছি আমি শুধু একটা দেহ। একটা ভোট। একটা পরিসংখ্যান।

আরাশ গতকাল জিজ্ঞেস করেছিল, “আব্বু, আপনি এত চুপচাপ কেন থাকেন?” কী বলব ওকে? বলব যে তোর আব্বুর আত্মা প্রতিদিন একটু একটু করে দাখিল হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন অফিসে? প্রতিটা সিলের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে আমার মানুষত্ব? প্রতিটা ফাইলে বন্দী হয়ে যাচ্ছে আমার স্বপ্নগুলো?

হ্যাপি রাতে বলে, “তুমি আগের মতো নেই। আগে তুমি গান গাইতে, গল্প করতে।” আমি নিজেও জানি আমি আগের মতো নেই। কিন্তু আমি কোথায় হারিয়ে গেছি? কোন ফাইলে বন্দী হয়ে আছি? কোন কাউন্টারে রেখে এসেছি আমার হাসি?

সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, এই আমলাতন্ত্র আমাকে শুধু ক্লান্ত করেনি, আমার মধ্যেও সেই রোগ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন আমি নিজেও মানুষকে নম্বর দিয়ে দেখি। নিজেও অন্যের কাজে বিরক্ত হই। নিজেও কখনো কখনো সেই কেরানির মতো আচরণ করি যাদের আমি ঘৃণা করি। আমি কি নিজেই একটা ছোট্ট অফিস হয়ে গেছি?

আজ আরাশের জন্মদিনের কেক কাটতে গিয়ে মনে হলো, আমি কি এই ছেলেটার জন্য কী পৃথিবী রেখে যাচ্ছি? একটা পৃথিবী যেখানে মানুষ মানুষ নয়, ফাইল নম্বর। যেখানে সততা একটা বিলাসিতা। যেখানে প্রতিটা স্বপ্নের জন্য একটা কাগজের অনুমতি লাগে।

আমি আরাশের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এই চোখে এখনো কৌতূহল আছে। এই মানুষটার মধ্যে এখনো জীবন আছে। কিন্তু কত দিন পর ওরও হাতে একটা ফাইল থাকবে? কত দিন পর ও-ও কোনো কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বলবে, “স্যার, প্লিজ একটু দেখেন”? কত দিন পর ও-ও আয়নায় নিজেকে চিনতে পারবে না?

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমার আত্মাটা কি ফেরত পাওয়া যাবে? আমি কি আবার সেই হায়দার হতে পারব যে স্বপ্ন দেখতো, গান গাইতো, মানুষকে ভালোবাসতো?” কিন্তু প্রার্থনার সময়ও মনে হয় এই প্রার্থনাটাও হয়তো কোথাও ফাইল হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, আমি জানি আমি একা নই। এই শহরে লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যাদের আত্মা বিভিন্ন অফিসে আটকে আছে। কেউ ব্যাংকের ফাইলে, কেউ আদালতের নথিতে, কেউ হাসপাতালের কাগজে। আমরা সবাই একটা অদৃশ্য কবরস্থানের বাসিন্দা।

আর সবচেয়ে বিয়োগান্তক ব্যাপার হলো, আমরা এই অবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা ভুলে গেছি যে আমরা একসময় পূর্ণ মানুষ ছিলাম। আমরা ভুলে গেছি আত্মা জিনিসটা কী। আমরা ভুলে গেছি কী করে স্বপ্ন দেখতে হয়।

রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আগামীকাল যদি কোনো অফিসে যেতে না হতো? যদি কোনো ফরম পূরণ করতে না হতো? যদি কোনো কাগজ জমা দিতে না হতো? তাহলে আমি কী করতাম? আমি কে হতাম?

কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। কারণ আমি ভুলে গেছি কাগজ ছাড়া জীবন কেমন হয়। আমি ভুলে গেছি অফিস ছাড়া একদিন কীভাবে কাটে।

আমি শুধু জানি, আমলাতন্ত্রের এই জালে আটকে থাকা প্রতিটা আত্মা একদিন চিৎকার করে বলবে – “আমি একটা মানুষ ছিলাম। আমার একটা নাম ছিল। আমার একটা স্বপ্ন ছিল।” কিন্তু সেই চিৎকার কে শুনবে? কোন ফাইলে সেই চিৎকার নথিভুক্ত হবে?

আর এই প্রশ্নের উত্তরেই হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *