প্রেজেন্টেশন শেষ করে হাত নামালাম। বসদের মুখে হাসি। একজন বলল, “চমৎকার। আপনার আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হয় প্রজেক্টটা হবেই।”
আমি হাসলাম। “ধন্যবাদ স্যার। আমি নিশ্চিত এটা সফল হবে।”
লিফটে উঠলাম। আয়নায় নিজেকে দেখলাম। টাই সোজা। চুল ঠিক। মুখে একটা হাসি।
কিন্তু ভেতরে একটা শব্দ বাজছে। “নিশ্চিত? সত্যিই?”
রিক্সায় বসে ফোন বাজল। হ্যাপি।
“কেমন গেল?”
“ভালো। বস খুশি।”
“তুমি ঠিক বলেছিলে তাহলে।”
আমি চুপ করে রইলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তার মোড়ে একটা ছেলে ফুচকা বিক্রি করছে। তার হাতের নড়াচড়া অভ্যস্ত। নিশ্চিত। সে জানে কী করছে।
“শুনছ?”
“হ্যাঁ।”
“কী হলো?”
“কিছু না।”
বাসায় ঢুকতেই আরাশ দৌড়ে এল। “বাবা, তুমি কি সাঁতার পারো?”
আমি জুতো খুলছিলাম। “না।”
“কেন?”
“শিখিনি।”
“তুমি তো বড় মানুষ। বড় মানুষরা সব পারে না?”
আমি তার দিকে তাকালাম। তার চোখে প্রশ্ন। আমি হাসলাম। “না বাবা। সব পারে না।”
“কিন্তু তুমি বলেছিলে বাবা সব পারে।”
আমি থেমে গেলাম। কবে বলেছিলাম? কেন বলেছিলাম?
“বলেছিলাম?”
“হ্যাঁ। যখন আমি সাইকেল শিখছিলাম। তুমি বলেছিলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাবা সব পারে।”
আমি তার মাথায় হাত দিলাম। “বাবা অনেক কিছু পারে। কিন্তু সব না।”
“তাহলে তুমি কেন বলেছিলে?”
আমার কাছে উত্তর ছিল না।
রাতে খাওয়ার টেবিলে হ্যাপি বলল, “জামিউর ফোন করেছিল। বলল তুমি ফোন ধরছ না।”
“কবে করেছিল?”
“আজ বিকেলে।”
“ব্যস্ত ছিলাম।”
“সে বলছিল তোমার সাথে রাজনীতি নিয়ে কথা হলে ভালো লাগে। তুমি নাকি সব বুঝে যাও।”
আমি চুপ করে ভাত খেতে থাকলাম।
“কী হলো? তুমি তো আগে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসতে।”
“এখনও ভালোবাসি।”
“তাহলে?”
“আমি কিছু বুঝি না হ্যাপি।”
সে চামচ রেখে দিল। “কী বলছ?”
“দেশের পরিস্থিতি কেমন হবে, কার জেতা উচিত, কোন নীতি ঠিক — এসব আমি জানি না। কিন্তু জামিউরের সাথে বসে এমনভাবে বলি যেন আমি সব জানি।”
“কিন্তু তুমি তো খবর পড়ো। বিশ্লেষণ করো।”
“পড়ি। কিন্তু পড়লেই কি জানা হয়?”
হ্যাপি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তুমি কি ঠিক আছ?”
“জানি না।”
সেই রাতে ফজরের আজান হলো। আমি উঠলাম। অজু করলাম। নামাজে দাঁড়ালাম।
সুরা ফাতিহা পড়তে পড়তে মনে হলো, আমি কি বিশ্বাস করি? নাকি বিশ্বাস করার ভান করছি?
“ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম।”
পথ দেখাও। সঠিক পথ।
কিন্তু আমি কি জানি আমি পথ খুঁজছি? নাকি আমি ভাবছি আমি ঠিক পথেই আছি?
রুকুতে গেলাম। মাথা নামলাম।
“সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম।”
পবিত্র আমার মহান রব।
আমার মনটা কি পবিত্র? নাকি আমি নিজেকে পবিত্র মনে করি?
সিজদায় গেলাম। মাথা মাটিতে ঠেকলাম।
অন্ধকার। শুধু নিজের শ্বাসের শব্দ।
আমি কি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করছি? নাকি আমি আচার পালন করছি?
সকালে অফিসে ঢুকতেই একজন কলিগ বলল, “স্যার, গতকালের প্রেজেন্টেশন দারুণ ছিল। আপনার আত্মবিশ্বাস দেখে শিখছি।”
আমি হাসলাম। “ধন্যবাদ।”
নিজের কেবিনে ঢুকলাম। কম্পিউটার চালু করলাম। ইমেইল চেক করলাম।
একটা ইমেইল এসেছে। সাবজেক্ট: “প্রজেক্ট রিস্ক অ্যানালাইসিস।”
খুললাম। পড়লাম। প্রজেক্টের কিছু ঝুঁকির কথা লেখা। টেকনিক্যাল সমস্যা হতে পারে। বাজেট বাড়তে পারে। সময় লাগতে পারে।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
গতকাল প্রেজেন্টেশনে বলেছিলাম, “আমি নিশ্চিত এটা সফল হবে।”
কিন্তু এই ইমেইল পড়ে কী মনে হচ্ছে? ভয়। সন্দেহ।
তাহলে গতকাল আমি কী ছিলাম?
দুপুরে খেতে খেতে মনে পড়ল বাবার কথা।
বাবা মারা যাওয়ার পরদিন আত্মীয়রা এসেছিল। সবাই বলছিল, “এখন তোমার দায়িত্ব। তুমি সামলাবে।”
আমি মাথা নাড়িয়েছিলাম। “হ্যাঁ। আমি সামলাব।”
কিন্তু সেদিন রাতে একা ঘরে বসে কেঁদেছিলাম। কান্না থামানো যাচ্ছিল না।
পরদিন সকালে মায়ের কাছে গিয়ে বলেছিলাম, “চিন্তা করবেন না। আমি সব দেখব।”
আমার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। মুখে ছিল হাসি।
কিন্তু ভেতরে? ভেতরে ছিল একটা বাচ্চা যে জানত না কী করতে হবে।
তাহলে সেই সময়ের আমি কী ছিলাম? আত্মবিশ্বাসী? নাকি ভয়ার্ত?
বিকেলে জামিউর ফোন করল।
“কী রে, আজকাল কথা বলিস না কেন?”
“ব্যস্ত।”
“শোন, পরশু আড্ডা হবে। বাবু, সাইফুল সবাই আসবে। তুই আসবি তো?”
“দেখি।”
“দেখি মানে? তোর সাথে কথা না হলে মজা হয় না। তোর বিশ্লেষণ শুনতে ভালো লাগে।”
“আমার কোনো বিশ্লেষণ নেই জামিউর।”
“কী বলছিস?”
“আমি শুধু কথা বলি। কিন্তু আমি কিছু জানি না।”
“হাসছিস?”
“না।”
জামিউর চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুই কি ঠিক আছিস?”
“জানি না।”
“মানে?”
“জানি না মানে জানি না।”
জামিউর আবার চুপ। তারপর বলল, “ঠিক আছে। পরে কথা হবে।”
ফোন কেটে গেল।
সন্ধ্যায় আরাশকে পড়াতে বসলাম।
“বাবা, তুমি কি সব প্রশ্নের উত্তর জানো?”
“না।”
“কিন্তু তুমি তো আমার সব প্রশ্নের উত্তর দাও।”
“সেগুলো সহজ প্রশ্ন।”
“তাহলে কঠিন প্রশ্নের উত্তর জানো না?”
“জানি না।”
আরাশ আমার দিকে তাকাল। “তাহলে তুমি যখন জানো না, তখন কী করো?”
আমি থমকে গেলাম। “কী করি?”
“হ্যাঁ। তুমি কি বলো যে জানো না? নাকি এমনভাবে বলো যেন জানো?”
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। সাত বছরের একটা বাচ্চা। কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।
“আমি… আমি চেষ্টা করি উত্তর দিতে।”
“কিন্তু তুমি যদি না জানো, তাহলে তোমার উত্তর কি ভুল হতে পারে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তুমি কেন দাও?”
আমি তার মাথায় হাত দিলাম। “কারণ… কারণ আমি ভয় পাই বলতে যে আমি জানি না।”
আরাশ মাথা নাড়ল। “ও।”
তারপর সে আবার বইয়ে মুখ দিল।
রাতে হ্যাপি বিছানায় শুয়ে বইপড়ছিল। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকালাম।
“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“কী?”
“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”
সে বই নামিয়ে রাখল। “এই প্রশ্ন কেন?”
“জানতে চাই।”
“করি। তুমি কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“আমার মনে হয় আমি তোমাকে ঠকাই।”
“কীভাবে?”
“আমি তোমার সাথে তর্ক করি। এমনভাবে বলি যেন আমি নিশ্চিত যে আমি ঠিক। কিন্তু ভেতরে আমি জানি না আমি ঠিক কি না।”
“এটা স্বাভাবিক।”
“না। স্বাভাবিক হলো বলা যে আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু আমি সেটা বলি না। আমি জেদ করি। আমি তর্ক করি। কেন?”
হ্যাপি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি কি ভয় পাও?”
“কীসের?”
“দুর্বল দেখাতে।”
আমি জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। অন্ধকারে একটা ছায়া।
“হ্যাঁ। ভয় পাই।”
পরদিন প্রজেক্ট মিটিং ছিল। সবাই বসেছে। আমি দাঁড়িয়ে আপডেট দিচ্ছি।
“তো, আমরা সময়মতো এগোচ্ছি। কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয় না।”
একজন জুনিয়র হাত তুলল। “স্যার, ডেটাবেস ইন্টিগ্রেশনে কিছু সমস্যা হচ্ছে।”
“সমাধান হবে।”
“কিন্তু স্যার, এটা সিরিয়াস। সময় লাগতে পারে।”
আমি তার দিকে তাকালাম। তার মুখে দুশ্চিন্তা। আমার মুখে থাকার কথা আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু আমি বললাম, “তুমি ঠিক বলছ। এটা সিরিয়াস। আমি নিশ্চিত নই এটা সহজেই সমাধান হবে কি না।”
সবাই চুপ।
একজন বলল, “স্যার, আপনি তো বলেছিলেন সব ঠিকঠাক হবে।”
“বলেছিলাম। কিন্তু আমি ভুল হতে পারি।”
আরেকজন বলল, “তাহলে আমরা কী করব?”
“আমরা চেষ্টা করব। কিন্তু গ্যারান্টি দিতে পারব না।”
মিটিং শেষ হলো। সবাই বেরিয়ে গেল। আমি একা বসে রইলাম।
আমার ফোন বাজল। বস।
“প্রজেক্টে সমস্যা শুনলাম।”
“হ্যাঁ স্যার। হতে পারে।”
“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে—”
“জানি স্যার। আমি ভুল বলেছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার ভান করেছিলাম।”
বস চুপ করে রইল। তারপর বলল, “দেখো। সমাধান করো। এই সততা আগে থেকে দরকার ছিল।”
ফোন কেটে গেল।
বাসায় ফিরলাম। আরাশ ঘুমিয়ে গেছে। হ্যাপি রান্নাঘরে।
“খাবে?” সে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ।”
“কেমন গেল দিনটা?”
“ভালো না।”
“কী হয়েছে?”
“প্রজেক্টে সমস্যা। আমি বসকে বলেছি আমি নিশ্চিত ছিলাম না।”
“তিনি কী বললেন?”
“রাগ করলেন। কিন্তু সত্যি বলেছি।”
হ্যাপি প্লেট দিল। বসলাম খেতে।
“তুমি জানো,” আমি বললাম, “আমি সারাজীবন ভেবেছি আত্মবিশ্বাস মানে নিশ্চিত থাকা। কিন্তু এখন মনে হয় আত্মবিশ্বাস হলো স্বীকার করা যে আমি নিশ্চিত নই।”
হ্যাপি আমার পাশে বসল। “তুমি বদলাচ্ছ।”
“ভালো দিকে? নাকি খারাপ দিকে?”
“জানি না। তবে তুমি সৎ হচ্ছ।”
সেই রাতে ফজরে আবার উঠলাম। অজু করলাম। নামাজে দাঁড়ালাম।
এইবার আলাদা লাগল। আমি “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম” পড়লাম। পথ দেখাও।
এইবার মনে হলো আমি সত্যিই জানি না পথ কোনটা। আমি সত্যিই চাইছি পথ।
সিজদায় গেলাম। মাথা মাটিতে ঠেকলাম।
এইবার কান্না এল। কেন জানি না। শুধু কান্না এল।
উঠলাম। মুখ মুছলাম।
পরদিন অফিসে ঢুকতেই সেই জুনিয়র এল।
“স্যার, সমাধান পেয়েছি।”
“কী?”
“ডেটাবেস ইন্টিগ্রেশনের সমাধান। কাজ করবে বলে মনে হয়।”
“নিশ্চিত?”
সে হাসল। “না স্যার। কিন্তু চেষ্টা করব।”
আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম। “ঠিক আছে। চেষ্টা করো।”
বিকেলে সাইফুল ফোন করল।
“জামিউর বলছিল তুই বলেছিস তুই কিছু জানিস না। এটা কী হাসির কথা?”
“না। সিরিয়াস।”
“মানে?”
“মানে আমি সত্যিই কিছু জানি না। রাজনীতি, অর্থনীতি, জীবন — কিছুই না।”
“কিন্তু তোর মতামত ভালো। আমরা সবসময় শুনতে চাই।”
“মতামত আর জ্ঞান আলাদা জিনিস।”
সাইফুল চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুই ঠিক আছিস তো?”
“আছি। হয়তো প্রথমবারের মতো ঠিক আছি।”
রাতে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি এখনো ভয় পাও না জানো বলতে?”
“পাই। কিন্তু চেষ্টা করছি বলতে।”
“কেন?”
“কারণ না জানাটা লজ্জার কিছু না। ভান করাটা লজ্জার।”
আরাশ মাথা নাড়ল। “আমিও না জানলে বলব এখন থেকে।”
আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
গভীর রাতে বিছানায় শুয়ে আছি। চোখ খুলে আছে। হ্যাপি ঘুমিয়ে গেছে।
আমি ভাবছি। আমি কি আত্মবিশ্বাসী? নাকি আত্মবিভ্রান্ত ছিলাম?
উত্তর আসছে না। হয়তো উত্তর নেই।
হয়তো আমি এখনো জানি না।
হয়তো কখনো জানব না।
হয়তো এটাই ঠিক।
একটু ভাবনা রেখে যান