ব্লগ

আয়না

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকাল সাতটায় আয়নায় তাকাই। চোখদুটো অচেনা। চিবুকে তিন দিনের দাড়ি। এই লোক কে?

“তুমি ঠিক আছ,” আমি নিজেকে বলি। আয়নার লোকটা কিছু বলে না।


অফিসে ঢুকেছি সকাল নয়টায়। কম্পিউটার খুলেছি। ইমেইল খুলেছি। ফাইল খুলেছি।

সাইফুল এসে দাঁড়াল টেবিলের পাশে। “ভাই, খুশি আছেন?”

“হ্যাঁ।”

“সত্যি?”

আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে চলে গেল।

আমি কি খুশি? জানি না। খুশি কেমন লাগে? ভুলে গেছি।


রাত দশটায় বিছানায় শুয়ে আছি। হ্যাপি পাশে। ফোনে কিছু দেখছে। আমিও ফোনে কিছু দেখছি।

“আজ কেমন ছিল?” সে জিজ্ঞেস করল।

“ঠিক আছে। তোমার?”

“ঠিক আছে।”

আমরা চুপ। ফ্যান ঘুরছে। বাইরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।

“কাল আরাশের স্কুলে যেতে হবে,” সে বলল।

“হুম।”

আরও চুপ। আমরা দুজনেই ফোনে তাকিয়ে আছি। আমাদের মাঝখানে একটা বিছানা। আমাদের মাঝখানে অনেক দূরত্ব।

আমরা কি ভালোবাসি? আমি জানি না। এটা কি ভালোবাসা? নাকি শুধু অভ্যাস?


শুক্রবার বিকেলে আরাশ খেলছে। গাড়ি নিয়ে। আমি পাশে বসে আছি।

“বাবা, তুমি কি খুশি?” সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।

“কেন জিজ্ঞেস করলি?”

“তুমি তো হাসো না।”

আমি হাসলাম। একটু জোর করে। “দেখ, হাসলাম তো।”

সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কিছু একটা আছে। প্রশ্ন হয়তো। বা সন্দেহ।

“এটা সত্যিকারের হাসি না,” সে বলল। তারপর আবার গাড়ি নিয়ে খেলতে লাগল।

আমি বসে রইলাম। আমার ছেলে আমাকে চেনে না। আমি আমার ছেলেকে চিনি না। আমরা একসাথে থাকি। আমরা একা।


রাতে নামাজে দাঁড়িয়েছি। সূরা পড়ছি। কিন্তু মন নেই। মন কোথায়? জানি না। হয়তো অফিসে। হয়তো কালকের চিন্তায়। হয়তো কোথাও নেই।

সেজদায় মাথা রাখলাম। “আল্লাহ, আমি কোথায়?” বললাম মনে মনে।

কোনো উত্তর নেই। শুধু নীরবতা।

উঠে বসলাम। আবার সেজদা দিলাম। “আমি কে?” জিজ্ঞেস করলাম।

নীরবতা।

নামাজ শেষ করলাম। বসে রইলাম। আমার ঈমান কোথায়? আমার আল্লাহ কোথায়? আমি কোথায়?


কয়েক মাস আগে একদিন বাবু এসেছিল। আমার মামাতো ভাই।

“ভাইয়া, তুমি চাকরি ছেড়ে দিলে কেন?”

“জানি না।”

“মানে?”

“ভালো লাগছিল না।”

“তারপর কী করবে?”

“জানি না।”

সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তুমি পাগল হয়ে গেছ নাকি?”

হয়তো। হয়তো পাগল হয়ে গেছি। হয়তো পাগল হওয়াটাই স্বাভাবিক।


আজ আবার আয়নায় দাঁড়িয়েছি। সকাল সাতটা।

“তুমি কে?” জিজ্ঞেস করলাম আয়নার লোকটাকে।

সে কিছু বলল না।

“তুমি খুশি?”

সে চুপ।

“তুমি কোথায় যাচ্ছ?”

সে শুধু তাকিয়ে আছে। তার চোখে কিছু নেই। শুধু শূন্যতা।

আমি আয়না থেকে সরে এলাম। গেলাম রান্নাঘরে। চা বানালাম। চায়ে চুমুক দিলাম। ঠান্ডা হয়ে গেছে। খাইনি।


কিছুদিন আগে হ্যাপি জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি আমাকে ভালোবাসো?”

আমি থমকে গিয়েছিলাম। তারপর বলেছিলাম, “হ্যাঁ।”

“নিশ্চিত?”

“হুম।”

সে আর কিছু বলেনি। আমিও না।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকে গেছে। আমি কি সত্যিই ভালোবাসি? ভালোবাসা মানে কী? একসাথে থাকা? নাকি একে অপরকে জানা? নাকি একে অপরকে অনুভব করা?

আমরা একসাথে থাকি। কিন্তু আমরা কি একে অপরকে জানি?


সন্ধ্যায় ছাদে উঠেছিলাম। শহরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হাজারো বাতি জ্বলছে। হাজারো মানুষ। হাজারো জীবন।

কতজন খুশি? কতজন শুধু ভান করছে?

আরাশ উঠে এসেছিল ছাদে। “বাবা, কী দেখছ?”

“ওই বাতিগুলো।”

“কেন?”

“জানি না। ভালো লাগছে।”

সে আমার পাশে দাঁড়াল। আমরা দুজনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

“বাবা, তুমি কি একা লাগে?” সে জিজ্ঞেস করল।

আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। সাত বছরের একটা বাচ্চা। সে কীভাবে জানল?

“মাঝে মাঝে,” আমি বললাম।

“আমরা তো আছি। মা আছে, আমি আছি।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে একা লাগে কেন?”

আমার কোনো উত্তর নেই। আমি শুধু তার মাথায় হাত রাখলাম।


রাতে শুয়ে ভাবছিলাম। আমার জীবন কেমন হওয়ার কথা ছিল? আমি কী চেয়েছিলাম? মনে নেই।

কখন ভুলে গেলাম? কোন দিন? কোন মুহূর্ত?

আমি কি কখনো জানতাম? নাকি আমি সবসময়ই জানতাম না?


আজ অফিসে বসে ছিলাম। কাজ করছিলাম। মানে কাজ করার ভান করছিলাম। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিছু দেখছিলাম না।

সুলতান এসে বলল, “ভাই, ঠিক আছেন?”

“হ্যাঁ।”

“মনে হচ্ছে না। অসুস্থ?”

“না।”

সে চলে গেল। আমি আবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমি কি ঠিক আছি? না। আমি ঠিক নেই। কিন্তু আমি কী বলব? আমি নিজেই জানি না কী হয়েছে।


গত রাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমি একটা ঘরে। দরজা নেই। জানালা নেই। শুধু দেয়াল। চারদিকে দেয়াল।

আমি চিৎকার করছিলাম। কিন্তু শব্দ বের হচ্ছিল না। আমি দৌড়াচ্ছিলাম। কিন্তু কোথাও যাচ্ছিলাম না।

ঘুম ভেঙে গেল। ঘাম হয়েছিল। হ্যাপি ঘুমাচ্ছিল। আমি বসে রইলাম। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

এটা কি আমার জীবন? একটা ঘর যার কোনো দরজা নেই?


আজ সকালে আবার আয়নায় তাকালাম। লোকটা এখনো সেখানে। তিরিশ সাতটা বছর সে আমার সাথে আছে।

“তুমি সুখী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সে মাথা নাড়ল না। কিছু বলল না।

“তুমি জানো তুমি কে?”

সে চুপ।

“আমি জানি না,” আমি বললাম। “আমি জানি না আমি কে। আমি জানি না আমি কী চাই। আমি জানি না আমি কোথায় যাচ্ছি।”

লোকটা তাকিয়ে রইল। তার চোখে কিছু দেখলাম। ভয় হয়তো। বা স্বীকার।


রান্নাঘরে গেলাম। হ্যাপি চা বানাচ্ছিল।

“তুমি সুখী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সে তাকাল আমার দিকে। তারপর আবার চায়ের পেয়ালায় তাকাল। “জানি না,” বলল।

“জানো না?”

“না। তুমি?”

“জানি না।”

আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। চায়ের ভাপ উঠছিল।

“আমরা কী করছি?” সে জিজ্ঞেস করল।

“জানি না।”

“এভাবে কতদিন?”

“জানি না।”

সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কিছু আছে। প্রশ্ন। বা ভয়।

আমিও তাকিয়ে রইলাম। আমাদের মাঝখানে একটা টেবিল। আমাদের মাঝখানে অনেক বছর। আমাদের মাঝখানে অনেক কিছু যা আমরা কখনো বলিনি।


বিকেলে আরাশকে নিয়ে পার্কে গিয়েছিলাম। সে খেলছিল। আমি বসে ছিলাম।

একজন বুড়ো লোক পাশে এসে বসল। “আপনার ছেলে?”

“হ্যাঁ।”

“সুন্দর।”

“ধন্যবাদ।”

আমরা চুপ করে বসে রইলাম। আরাশ ছুটছিল। হাসছিল।

“আপনি সুখী?” বুড়ো লোকটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

আমি অবাক হলাম। “কেন জিজ্ঞেস করলেন?”

“এমনি। আপনার চেহারায় কিছু একটা আছে।”

“কী আছে?”

“জানি না। কিছু নেই হয়তো। সেটাই সমস্যা।”

সে উঠে গেল। আমি বসে রইলাম।

কিছু নেই। হ্যাঁ। আমার ভেতরে কিছু নেই। শুধু শূন্যতা।


রাতে নামাজ পড়ছিলাম। সেজদায় মাথা রেখেছিলাম।

“আল্লাহ, আমি হারিয়ে গেছি,” বললাম। “আমি খুঁজে পাচ্ছি না নিজেকে।”

নীরবতা।

“আপনি কোথায়?”

নীরবতা।

“আমি কোথায়?”

কোনো উত্তর নেই। শুধু ঠান্ডা মেঝে। শুধু অন্ধকার।


আজ রাতে হ্যাপি ঘুমিয়ে গেছে। আরাশও। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। শহর ঘুমিয়ে যাচ্ছে। বাতি একটা একটা করে নিভছে।

আমি কি ঘুমাতে পারব? জানি না। ঘুমালেও কি ঘুম হবে? জানি না।

আমি ভাবছি। আমি তিরিশ সাতটা বছর বেঁচে আছি। কিন্তু আমি কতদিন সত্যিকার জেগে ছিলাম? কতদিন নিজেকে অনুভব করেছি?

হয়তো একদিনও না।

হয়তো আমি সবসময়ই ঘুমিয়ে ছিলাম। চোখ খোলা রেখে ঘুমিয়ে ছিলাম।


আয়নায় লোকটা এখনো আছে। সে আমার সবচেয়ে পুরনো সঙ্গী। সে কখনো আমাকে ছেড়ে যায়নি।

কিন্তু সে কে?

আমি? নাকি অন্য কেউ?

আমি তার দিকে তাকাই। সে আমার দিকে তাকায়।

আমরা দুজনে দেখি। কিন্তু আমরা কি চিনি?

না।

আমরা চিনি না।

হয়তো একদিন চিনব। হয়তো না।

হয়তো এটাই যথেষ্ট। না চেনা। না জানা।

হয়তো।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *