ব্লগ

অন্যদের চোখে নিজেকে দেখার আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আয়না

একটি কাল্পনিক গল্প


শপিংমলের কাচের দেয়ালে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সালাম সাহেব থমকে গেলেন।

এই লোকটা কে?


কাচে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কুঁজো পিঠ। ঝুলে পড়া কাঁধ। চোখের নিচে কালি। জামায় ভাঁজ।

সালাম সাহেব নিজের বুকে হাত দিলেন। হ্যাঁ, এই জামা তাঁর। এই শরীর তাঁর।

কিন্তু এই মানুষটা তিনি নন।

তিনি তো একজন যোদ্ধা। জীবনের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষ। সংগ্রামী। অদম্য।

তাহলে কাচে এই পরাজিত চেহারা কার?


সেই রাতে ঘুম এলো না।

শুয়ে শুয়ে ভাবলেন — মানুষ কি আমাকে এভাবেই দেখে?

এই কুঁজো পিঠ? এই ক্লান্ত চোখ? এই হতাশ মুখ?

আমি নিজেকে যা ভাবি, অন্যরা কি তা দেখে? নাকি অন্য কিছু দেখে?


পরদিন অফিসে গেলেন।

সহকর্মী রাকিব সামনে দিয়ে গেল। একটু মুচকি হাসি দিল।

সালাম সাহেব ভাবলেন — এই হাসির মানে কী?

সম্মান? নাকি করুণা?

রাকিব কি ভাবছে “বেচারা সালাম সাহেব, পনেরো বছর ধরে একই পদে”?


বস ডাকলেন।

“সালাম সাহেব, এই ফাইলটা দেখুন তো।”

সালাম সাহেব ফাইল নিলেন। বসের চোখের দিকে তাকালেন।

সেই চোখে কী আছে?

বিশ্বাস? নাকি সন্দেহ?

বস কি ভাবছেন “এই লোক দিয়ে কিছু হবে না, তবু দিয়ে দিই”?


দুপুরে ক্যান্টিনে গেলেন।

লাইনে দাঁড়ালেন। সামনে একজন তরুণ কর্মী।

সে সালাম সাহেবের দিকে তাকালো। তারপর সরে গিয়ে জায়গা করে দিল।

“আপনি আগে নিন।”

সালাম সাহেব ভাবলেন — কেন?

সম্মান? বয়সের প্রতি শ্রদ্ধা?

নাকি করুণা? “বুড়ো মানুষ, দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হবে”?


অফিস থেকে বের হলেন। রিকশা নিলেন।

রিকশাওয়ালা ভাড়া বললো। “পঞ্চাশ টাকা।”

সালাম সাহেব বললেন, “চল্লিশ।”

রিকশাওয়ালা রাজি হয়ে গেল। কোনো তর্ক নেই।

সালাম সাহেব ভাবলেন — কেন রাজি হলো?

কি আমার চেহারায় লেখা আছে “এই লোকের বেশি টাকা নেই”?

আমার জামা কি সস্তা দেখাচ্ছে? জুতো কি পুরনো দেখাচ্ছে?


বাসায় ফিরলেন।

স্ত্রী শারমিন দরজা খুললেন।

“এসেছ? খাবে?”

সাধারণ কথা। প্রতিদিনের কথা।

কিন্তু সালাম সাহেব ভাবলেন — শারমিনের গলায় কি একটু বিরক্তি ছিল?

সে কি ভাবছে “এই লোক কোনোদিন কিছু করতে পারলো না”?

বিয়ের সময় কত স্বপ্ন ছিল। বড় বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ।

কিছুই হয়নি।

শারমিন কি প্রতিদিন এই হিসাব করে?


ছেলে তানিম স্কুল থেকে ফিরেছে।

“বাবা, আমার বন্ধু রাফির বাবা নতুন গাড়ি কিনেছে।”

সালাম সাহেব চুপ করে রইলেন।

তানিম আর কিছু বললো না। কিন্তু সেই নীরবতায় কী ছিল?

“আমার বাবা গাড়ি কিনতে পারে না” — এই কথা?

তানিম কি স্কুলে লজ্জা পায়? “তোর বাবা কী করে?” — এই প্রশ্নের উত্তর দিতে?


রাতে খেতে বসলেন।

শারমিন ভাত বাড়লেন। মাছ দিলেন। ডাল দিলেন।

সালাম সাহেব খেতে লাগলেন। কিন্তু খাবার গলা দিয়ে নামছে না।

শারমিন কি ভাবছে “এত কষ্ট করে রান্না করলাম, এই লোক ঠিকমতো খায়ও না”?

তানিম কি ভাবছে “বাবার সাথে খেতে বিরক্ত লাগে”?


শুতে গেলেন।

শারমিন পাশে শুয়ে বই পড়ছেন।

সালাম সাহেব তাঁর দিকে তাকালেন।

এই মুখ তিনি বিশ বছর ধরে দেখছেন। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে চেনেন না।

শারমিন কি সুখী?

নাকি প্রতিদিন মনে মনে আফসোস করে “কেন এই লোককে বিয়ে করলাম”?


পরদিন ছুটির দিন।

বাজারে গেলেন।

সবজিওয়ালা দেখে বললো, “আসেন স্যার, আজ টমেটো ভালো আছে।”

সালাম সাহেব ভাবলেন — সে কি আমাকে “সস্তা খদ্দের” মনে করছে?

টমেটো বললো কারণ টমেটো সস্তা। আঙুর বললো না কারণ বুঝেছে আমি কিনতে পারব না।


মসজিদে গেলেন।

নামাজের পর একজন পরিচিত এগিয়ে এলেন।

“কেমন আছেন, সালাম ভাই?”

“ভালো।”

“অফিস কেমন?”

“চলছে।”

লোকটা মাথা নাড়লো। চলে গেল।

সালাম সাহেব ভাবলেন — “চলছে” শুনে সে কী বুঝলো?

“এই লোকের কিছু হয়নি, হবেও না” — এটা?


বিকেলে পার্কে গেলেন।

বেঞ্চে বসলেন।

পাশে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন।

সালাম সাহেব তাঁর দিকে তাকালেন।

বৃদ্ধও তাকালেন।

সালাম সাহেব ভাবলেন — এই বৃদ্ধ আমাকে কী মনে করছে?

“আরেকজন ব্যর্থ মানুষ”?

“আমার মতোই একা, হতাশ”?


বাসায় ফিরলেন।

শারমিন বললেন, “তোমার মুখ এত ম্লান কেন?”

“কিছু না।”

“কিছু তো আছে। বলো।”

সালাম সাহেব কী বলবেন?

বলবেন যে তিনি সারাদিন ভাবছেন মানুষ তাঁকে কীভাবে দেখে?

বলবেন যে তিনি নিজেকে যা মনে করেন, বাস্তবে তিনি তা নন?

বলবেন যে তিনি ভয় পাচ্ছেন — শারমিনও হয়তো তাঁকে ব্যর্থ মনে করে?

“কিছু না, একটু ক্লান্ত।”


রাতে আবার ঘুম এলো না।

সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন —

আমি কি সত্যিই ব্যর্থ?

পনেরো বছর চাকরি করছি। সংসার চালাচ্ছি। ছেলেকে পড়াচ্ছি। সব দায়িত্ব পালন করছি।

এটা কি ব্যর্থতা?

নাকি মানুষের চোখে ব্যর্থতা অন্য কিছু?

গাড়ি নেই, তাই ব্যর্থ?

বড় বাড়ি নেই, তাই ব্যর্থ?

প্রমোশন হয়নি, তাই ব্যর্থ?


হঠাৎ একটা কথা মনে পড়লো।

ছোটবেলায় মা বলতেন, “তুই আমার গর্ব।”

সালাম সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।

মা এখন নেই। কিন্তু মা কি এখনো তাঁকে “গর্ব” মনে করতেন?

নাকি বলতেন “আমার ছেলে কিছু করতে পারলো না”?


পরদিন অফিসে গেলেন।

সারাদিন কাজ করলেন।

কিন্তু মাথায় একটাই চিন্তা — মানুষ আমাকে কীভাবে দেখছে?

বস কি ভাবছে আমি অযোগ্য?

সহকর্মীরা কি ভাবছে আমি বোকা?

পিয়ন কি ভাবছে এই লোকের কোনো ক্ষমতা নেই?


এই চিন্তা তাঁকে গ্রাস করে ফেললো।

এখন রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় সবাই তাকাচ্ছে।

দোকানে গেলে মনে হয় সবাই বিচার করছে।

অফিসে বসলে মনে হয় সবাই হাসছে।

বাড়িতে থাকলে মনে হয় শারমিন আফসোস করছে।


একদিন তানিম জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, তুমি কি আমাকে নিয়ে গর্বিত?”

সালাম সাহেব অবাক হলেন।

“কেন জিজ্ঞেস করছিস?”

“এমনি।”

“অবশ্যই গর্বিত।”

তানিম একটু হাসলো। তারপর বললো, “আমিও তোমাকে নিয়ে গর্বিত।”

সালাম সাহেব স্থির হয়ে গেলেন।

“কেন?”

“তুমি আমাদের জন্য এত কষ্ট করো। কখনো অভিযোগ করো না।”


সেই রাতে সালাম সাহেব অনেকক্ষণ জেগে রইলেন।

তানিমের কথা ভাবলেন।

একটা বাচ্চা ছেলে তাঁকে দেখছে “কষ্টসহিষ্ণু বাবা” হিসেবে।

শারমিন কি একইভাবে দেখে?

নাকি অন্যভাবে?


পরদিন সাহস করে শারমিনকে জিজ্ঞেস করলেন।

“তুমি কি আমাকে নিয়ে সুখী?”

শারমিন অবাক হলেন।

“কেন এমন প্রশ্ন?”

“বলো না।”

শারমিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তুমি কি মনে করো আমি সুখী না?”

“জানি না।”

“বিশ বছর একসাথে আছি। তুমি জানো না?”

সালাম সাহেব চুপ করে রইলেন।

শারমিন বললেন, “আমি সুখী। তুমি ভালো মানুষ। এটুকুই যথেষ্ট।”


সালাম সাহেব বুঝলেন — মানুষ তাঁকে যেভাবে দেখে, সেটা তিনি জানেন না।

তিনি শুধু কল্পনা করেন।

এবং সেই কল্পনা তাঁকে ধ্বংস করছে।

হয়তো রাকিবের হাসি ছিল বন্ধুত্বের।

হয়তো রিকশাওয়ালা রাজি হয়েছিল কারণ চল্লিশ টাকাই ঠিক ছিল।

হয়তো সবজিওয়ালা টমেটো বলেছিল কারণ সত্যিই টমেটো ভালো ছিল।

হয়তো কেউ তাঁকে ব্যর্থ মনে করে না।

শুধু তিনি নিজে করেন।


আজ সকালে আয়নায় দাঁড়ালেন।

দেখলেন একজন মানুষকে।

ক্লান্ত? হ্যাঁ।

কিন্তু পরাজিত? জানি না।

হয়তো এই চোখের কালি সংগ্রামের চিহ্ন।

হয়তো এই কুঁজো পিঠ দায়িত্বের ভার।

হয়তো এই মানুষটা যোদ্ধা।

অন্যরা কী দেখে — সেটা তাঁর হাতে নেই।

তিনি কী দেখেন — সেটা তাঁর হাতে আছে।


[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *