হ্যাপি বলেছিল, “তুমি একটু বেশি লেখালেখি কর। আমার সাথে সময় কাটাও না।”
আমি সেদিন থেকে লেখালেখি কমিয়ে দিলাম।
হ্যাপি বলেছিল, “তুমি বন্ধুদের সাথে খুব বেশি কথা বল ফোনে। আমার কথা শোনো না।”
আমি সেদিন থেকে বন্ধুদের সাথে কম কথা বলি।
হ্যাপি বলেছিল, “তুমি ক্রিকেট দেখে সময় নষ্ট কর। আরাশের পড়াশোনায় মনোযোগ দাও।”
আমি ক্রিকেট দেখা বন্ধ করে দিলাম।
কিন্তু আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ভাবছি—আমি কে?
আমি যে মানুষটি ছিলাম, সে কোথায় গেল?
আমি একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতে পারতাম। কবিতা পড়তাম। বন্ধুদের সাথে জীবন নিয়ে তর্ক করতাম। ক্রিকেট দেখে উত্তেজিত হতাম।
এখন আমি শুধু হ্যাপির মতামতের অপেক্ষা করি। সে কী চায়, সেটাই করি।
আমি কি একটা ভালো স্বামী? নাকি আমি একটা পুতুল হয়ে গেছি?
গত সপ্তাহে আমার একটা কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকায়। আমি হ্যাপিকে দেখিয়েছিলাম। সে বলেছিল, “ভালো। কিন্তু এইসব লিখে কি কোনো টাকা হবে?”
আমার ভিতরের লেখকটা সেদিন মরে গেল।
আমি একটা সরকারি চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছি। হ্যাপি খুশি। সে বলেছে, “এইবার আমাদের জীবনে স্থিতিশীলতা আসবে।”
কিন্তু আমি কি স্থিতিশীলতা চাই? নাকি আমি চাই অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজের স্বপ্ন তাড়া করতে?
আমি জানি না। কারণ আমি জানি না আমি আসলে কী চাই।
আমার বন্ধু মৃদুল একবার বলেছিল, “তুমি হ্যাপির গোলাম হয়ে গেছ।”
আমি রেগে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, “আমি আমার স্ত্রীকে খুশি রাখি। এটা ভালোবাসা।”
কিন্তু এখন মনে হয়, মৃদুল হয়তো ঠিকই বলেছিল।
ভালোবাসা কি নিজেকে মুছে ফেলা? নাকি ভালোবাসা মানে দুজন মানুষের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখে একসাথে থাকা?
আমি হ্যাপিকে এতটা খুশি রাখতে গিয়ে নিজেকে অখুশি করে ফেলেছি।
গত মাসে আমার পুরনো একটা বই পড়ার ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু হ্যাপি বলেছিল, “এইসব পুরনো বই পড়ে কী হবে? আরাশের সাথে খেলো।”
আমি বইটা পড়িনি।
কিন্তু আজ ভাবছি—আমি যদি বই না পড়ি, লেখালেখি না করি, বন্ধুদের সাথে কথা না বলি, তাহলে আমি আরাশকে কী শেখাব? একটা খালি মানুষ তার ছেলেকে কী দিতে পারে?
আরাশ একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, তোমার শখ কী?”
আমি উত্তর দিতে পারিনি। কারণ আমার কোনো শখ নেই। আমার শখ হচ্ছে হ্যাপিকে খুশি রাখা।
আমি ভাবি, আমার বাবাও কি এমন ছিলেন? তিনিও কি আমার মায়ের খুশির জন্য নিজেকে মুছে ফেলেছিলেন?
হয়তো এটাই বাঙালি পুরুষের নিয়তি। আমরা স্বামী হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলি।
কিন্তু আমি চাই না আরাশ এই ভুল করুক। আমি চাই সে জানুক যে, ভালোবাসা মানে নিজেকে বিসর্জন দেওয়া নয়।
আমি হ্যাপিকে বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আবার লিখব। আমি আমার বইগুলো পড়ব। আমি আমার বন্ধুদের সাথে কথা বলব।
হ্যাপি রাগ করবে হয়তো। কিন্তু আমি আর নিজেকে মুছে ফেলব না।
কারণ একটা মুছে যাওয়া মানুষ কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসা দিতে পারে না।
একটু ভাবনা রেখে যান