আজ সকালে আরাশ আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আব্বু, আমাদের পাশের বাড়ির কাকা কেন এত টাকা পায়? উনি তো কোনো কাজ করেন না।”
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম – কী বলবো তাকে? যে মানুষটা সরকারি টেন্ডারে দালালি করে কোটি টাকার মালিক, সে আমার চোখে চোর। কিন্তু সমাজের চোখে সে সফল ব্যবসায়ী। আরাশের চোখে সে একজন ভাগ্যবান মানুষ, যার কাছে যা চায় তাই আছে।
একই মানুষ, তিনটি আয়না, তিনটি প্রতিবিম্ব।
“আব্বু?” আরাশ আবার ডাকলো। আমি দেখলাম সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে সেই পরিচিত কৌতূহল – যেন পুরো পৃথিবীটা একটা বড় ধাঁধা, আর সে সেটার সমাধান খুঁজছে।
“কাজ মানে শুধু অফিসে গিয়ে ফাইল দেখা নয়, বাবা,” আমি বললাম। “কেউ টাকা দিয়ে কাজ করায়, কেউ কথা দিয়ে, কেউ ভয় দেখিয়ে।”
কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন এলো – আমি কি সত্যি বলছি? নাকি নিজের ব্যর্থতাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করছি?
হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ওর মুখে সেই চেনা চিন্তার ছাপ – মাসের শেষে টাকা হবে তো? আরাশের স্কুলের ফি, বাজার, ঘরভাড়া। ওর চোখে আমি একজন ভালো মানুষ যে কষ্ট করে সংসার চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু রাতে যখন ও ঘুমিয়ে যায়, আমি জানি ও ভাবে – “আহ, যদি একটু বেশি practical হতো!”
আমার বড় ভাই মনে করেন আমি স্বপ্নবাজ। আমার বন্ধু জামিউর বলে আমি বেশি honest. আমার পুরনো বস ভাবতেন আমি কাজের প্রেশার নিতে পারি না। প্রতিটি মানুষ আমাকে নিয়ে আলাদা গল্প বানিয়েছে, আলাদা সত্য তৈরি করেছে।
কিন্তু আসল আমি কে?
সেদিন আরাশের স্কুলের অভিভাবক সভায় গিয়েছিলাম। অন্য বাবারা তাদের ছেলেমেয়েদের marks নিয়ে তর্ক করছিলেন। আমি দেখলাম, আরাশের ক্লাসটিচার তাকে নিয়ে গর্ব করছেন – “ও অনেক মেধাবী, কিন্তু একটু অন্যরকম। সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করে।”
টিচারের চোখে আরাশ একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আমার চোখে সে আমার সব স্বপ্নের প্রতিবিম্ব। হ্যাপির চোখে সে জীবনের একমাত্র আনন্দ। কিন্তু আরাশ নিজে? সে কি জানে সবাই তাকে নিয়ে কত রকম গল্প বানিয়েছে?
রাতে যখন আরাশ ঘুমিয়ে যায়, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি। দেখি, পাশের বাড়ির সেই লোকটা বিকেলে নামাজ পড়ছে। মসজিদে গিয়ে দান করছে। ওর পরিবারের সবাই ওকে শ্রদ্ধা করে। ওর চোখে নিজেকে নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই – সে জানে সে একজন সফল মানুষ, একজন ভালো মুসলিম, একজন দায়িত্বশীল পিতা।
তাহলে কে ঠিক? আমি, যে ওকে চোর বলি? নাকি সমাজ, যে ওকে সফল বলে? নাকি ওর পরিবার, যারা ওকে আদর্শ বলে মানে?
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি। কখনো মনে হয় একজন নীতিবান মানুষকে দেখছি, যে পরিষ্কার বিবেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। কখনো মনে হয় একজন ব্যর্থ মানুষকে দেখছি, যে নিজের দুর্বলতাকে আদর্শের নামে লুকিয়ে রাখে। কখনো মনে হয় একজন সাধারণ মানুষকে দেখছি, যে বুঝতে পারছে না কোনটা সত্যি।
আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় আমি কী চাই? আমি চাই স্পষ্টতা। চাই জানতে – আমি কি সত্যিই সৎ, নাকি শুধু দুর্বল? আমার নীতি কি আসলেই নীতি, নাকি অযোগ্যতার আড়াল?
কিন্তু হয়তো এটাই সত্য – আমরা সবাই অসংখ্য আয়নার ভেতর বেঁচে থাকি। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিস্থিতি, প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের আলাদা আলাদা রূপ দেখায়। আর আমরা ভাবি কোনটা আসল।
হয়তো সবগুলোই আসল। হয়তো কোনোটাই না।
আরাশ আবার এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। “বাবা, আমি কি বড় হয়ে ভালো মানুষ হবো?”
আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। “তুমি ভালো মানুষ হবে কি না, সেটা নির্ভর করবে কে তোমাকে দেখছে তার ওপর। কিন্তু তুমি যেরকম মানুষ হতে চাও, সেটাই আসল কথা।”
ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। ওর চোখে আমি দেখলাম আরেকটা আয়না – যেখানে আমি একজন বাবা, যে তার ছেলেকে জীবনের জটিলতা বুঝতে শেখাচ্ছে।
হয়তো এই আয়নাটাই সবচেয়ে পরিষ্কার।
একটু ভাবনা রেখে যান