ব্লগ

আয়নার খোঁজে আত্মা

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ফোনের ফ্রন্ট কযামেরা অন করতেই আমার মুখটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল। তারপর শুরু হল সেই চেনা নাটক – ক্যামেরা একটু উপরে, একটু নিচে, একটু ডানে, একটু বামে।

হ্যাপি দেখে হেসে দিল, “আরে হায়দার, একটা ছবি তুলতে এত মাথা ঘামাস কেন?” আমি বলতে পারলাম না যে এই মুহূর্তে আমি নিজের সাথে যুদ্ধ করছি।

কোন অ্যাঙ্গেলে আমাকে সবচেয়ে ভালো লাগে? কোন আলোয়? চোখের নিচের কালি ঢাকা যায় কিভাবে? গালের মোটা ভাব কমানো যায় কিভাবে?

আরাশ এসে বলল, “বাবা, এই ক্যামেরাটা মানুষের মুখ উল্টো করে কেন?” আমি থমকে গেলাম। হ্যাঁ, এটা ঠিক। সেলফি ক্যামেরা আমাদের মুখ মিরর ইমেজে দেখায়। মানে আমি যেভাবে আয়নায় নিজেকে দেখি, সেভাবেই।

কিন্তু আসল ছবিতে আমি উল্টো হয়ে যাই। মানে অন্যরা আমাকে যেভাবে দেখে। আর সেটা আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগে। কারণ আমি অভ্যস্ত আয়নার হায়দারের সাথে, আসল হায়দারের সাথে নয়।

৫০তম বার ক্যামেরা অ্যাডজাস্ট করলাম। এবার মনে হল ঠিক হয়েছে। কিন্তু ক্লিক করার আগেই আবার মনে হল – না, আরেকটু উপরে হলে ভালো হত।

আমি বুঝলাম এই সংগ্রামটা শুধু ছবি তোলার না। এটা নিজেকে গ্রহণ করার সংগ্রাম। আমি আয়নায় যে হায়দারটাকে দেখি, সেই হায়দারটাকে পছন্দ করি। কিন্তু ক্যামেরায় যে হায়দারটা ধরা পড়ে, সেটা যেন আরেকজন।

কোনটা সত্যি? আয়নার হায়দার নাকি ক্যামেরার হায়দার?

আরেকটা সমস্যা হল – আমি জানি এই ছবিটা অন্যরা দেখবে। আমার অফিসের সহকর্মীরা, পুরনো বন্ধুরা, আত্মীয়রা। সবার চোখে আমাকে কেমন লাগব? আকর্ষণীয় লাগব? নাকি বুড়ো লাগব? নাকি ভালো মানুষ লাগব?

১০০তম বার ক্যামেরার পজিশন পাল্টালাম। এবার একটু হাসতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেই হাসি কৃত্রিম লাগল। আসল হাসি আর সেলফি হাসি কি একই জিনিস?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আমার দাদুর একমাত্র ছবিটার কথা। সাদা কালো, পাসপোর্ট সাইজ। খুব গম্ভীর মুখ। কোনো পোজ নেই, কোনো অ্যাঙ্গেল নেই। শুধু একটা সত্যিকারের মুখ।

আমার এই ১০০ বার ক্যামেরা ঘোরানোটা কি সেই সত্যিকারের মুখটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা? নাকি একটা নকল মুখ বানানোর চেষ্টা?

শেষমেষ একটা ছবি তুললাম। দেখে মনে হল ঠিক হয়েছে। পোস্ট করলাম। কয়েকটা লাইক এল। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে গেল – এই যে ছবিতে হায়দার, এটা আমি? নাকি আমি যা হতে চাই?

আয়নায় নিজেকে খুঁজতে গিয়ে কখন যেন আয়নাতেই আটকে গেছি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *