সকালে আয়নার সামনে দাঁড়াই।
শেভিং ফোম লাগাই। সাদা ফেনা। মুখ ঢেকে যায়।
ব্লেড চালাই। একটু একটু করে মুখ বেরিয়ে আসে।
কিন্তু কোন মুখ?
অফিসে ঢুকে সাইফুল বলে, “ভালো আছিস?”
“হ্যাঁ, একদম।”
“তোকে দেখে মনে হচ্ছে।”
সে চলে যায়।
আমি ভাবি, একদম ভালো। কথাটা মুখ থেকে বের হলো। কিন্তু ভেতরে কী আছে? ভেতরে তো অন্য কিছু। অন্য কেউ।
মিটিংয়ে বস কথা বলছেন। সবাই মাথা নাড়ছে। আমিও নাড়ছি।
হাসি দিচ্ছি। সঠিক জায়গায়। সঠিক সময়ে।
মিটিং শেষে বস বলেন, “তোমার মতো মানুষ দরকার।”
“ধন্যবাদ।”
বাথরুমে গিয়ে আয়নায় তাকাই। লোকটা হাসছে।
কিন্তু চোখদুটো হাসছে না।
বাড়ি ফিরে আরাশ দৌড়ে আসে।
“বাবা!”
কোলে তুলে নিই। সে গলা জড়িয়ে ধরে।
আমি হাসি। বলি, “কেমন আছ?”
“ভালো! তুমি?”
“আমিও ভালো।”
সে আমার গালে চুমু দেয়। নরম, ভেজা।
আমি তাকে নামিয়ে দিই।
হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বলে, “খাবে এখন?”
“একটু পরে।”
ঘরে যাই। দরজা বন্ধ করি। বিছানায় বসি।
এইমাত্র আমি হাসলাম। কিন্তু ভেতরে কিছু ছিল না। শূন্য।
রাতে খাওয়ার সময় হ্যাপি বলে, “তুমি চুপচাপ কেন?”
“ক্লান্ত।”
“অফিসে কিছু হয়েছে?”
“না।”
আরাশ বলে, “বাবা, তুমি আমার সাথে লুডু খেলবে?”
“খেলব।”
“এখন?”
“খাওয়ার পর।”
খাওয়ার পর লুডু খেলি। হাসি। ছক্কা ফেলে চিৎকার করি।
আরাশ জিতে যায়। খুশিতে লাফায়।
আমি তার মাথায় হাত রাখি।
“বাবা, তুমি খুশি?”
“হ্যাঁ।”
সে আমার দিকে তাকায়। একটু বেশি সময় ধরে।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি।”
রাতে হ্যাপির পাশে শুয়ে থাকি। সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছি।
সারাদিন আমি কে ছিলাম? অফিসে যে লোক হাসছিল, মাথা নাড়ছিল—সে কে? আরাশের সাথে যে লোক লুডু খেলছিল, চিৎকার করছিল—সে কে?
আর এই যে এখন শুয়ে আছি, ভাবছি—এটা কে?
পরদিন জামিউরের সাথে দেখা।
সে বলে, “কী খবর?”
“ভালো।”
“তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে না।”
“ঘুম কম হয়েছে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
“তুই আমাকে সব বলিস না।”
“কী বলব?”
“জানি না। কিন্তু কিছু একটা আছে।”
চা আসে। চুমুক দিই। তেতো।
“কিছু নেই।”
“ঠিক আছে।”
সে অন্য বিষয়ে চলে যায়। আমি শুনি। মাথা নাড়ি। হাসি।
বাড়ি ফেরার পথে ভাবি, জামিউরের সামনে আমি কে ছিলাম? বন্ধু? নাকি বন্ধুর মতো দেখতে কেউ?
হ্যাপি একদিন বলেছিল, “তুমি অনেক গভীর।”
“মানে?”
“মানে… তোমার ভেতরে অনেক কিছু আছে যেটা তুমি বলো না।”
“সেটা ভালো না খারাপ?”
“জানি না। কিন্তু সত্যি।”
সেই রাতে ভেবেছিলাম, সে কি দেখতে পায়? ভেতরের সেই অন্য মানুষটাকে?
একদিন অফিস থেকে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
শার্ট খুললাম। প্যান্ট খুললাম। গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
আয়নায় একটা লোক। চেনা চেহারা। আমার চেহারা।
কিন্তু চোখদুটো অচেনা।
সারাদিন যে হাসি দিয়েছি, যে কথা বলেছি, যে মাথা নেড়েছি—সেগুলো কার ছিল?
সেই রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর বারান্দায় গেলাম।
একা বসলাম।
রাস্তায় কেউ নেই। দূরে একটা কুকুর ডাকছে।
ভাবলাম, দিনের বেলা আমি একজন। রাতে আরেকজন।
দিনের লোকটা জানে কীভাবে হাসতে হয়। কীভাবে কথা বলতে হয়। কীভাবে সবাইকে খুশি রাখতে হয়।
রাতের লোকটা জানে না কিছুই। সে শুধু বসে থাকে। ভাবে। প্রশ্ন করে।
কোনটা আমি?
পরদিন সকালে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি রাতে কী করো?”
“ঘুমাই।”
“সবসময়?”
“হ্যাঁ।”
“কাল রাতে আমি তোমাকে বারান্দায় দেখেছি।”
চুপ করে রইলাম।
“তুমি কী করছিলে?”
“বসে ছিলাম।”
“কেন?”
“ঘুম আসছিল না।”
সে একটু ভাবল।
“তুমি কি দুঃখী?”
“না।”
“তাহলে?”
“তাহলে কিছু না। বড়রা মাঝে মাঝে বসে থাকে।”
সেই রাতে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছো?”
“হ্যাঁ।”
“সত্যি?”
“কেন?”
“আরাশ বলল তুমি রাতে বারান্দায় বসে থাকো।”
“মাঝে মাঝে।”
“কী ভাবো?”
চুপ করে রইলাম।
“বলো।”
“কিছু না।”
“তুমি সবসময় কিছু না বলো।”
সে উঠে গেল।
পরদিন অফিসে গিয়ে সবার সাথে কথা বললাম। হাসলাম। মিটিংয়ে মতামত দিলাম।
বাড়ি ফিরে আরাশের সাথে খেললাম। হ্যাপির সাথে কথা বললাম।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর বারান্দায় গেলাম।
একই জায়গায়। একই অন্ধকার।
ভাবলাম, দুটো লোক। একটা দিনের। একটা রাতের।
কোনটা আসল?
নাকি দুটোই?
নাকি কোনোটাই না?
সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
শেভিং ফোম লাগালাম। মুখ ঢেকে গেল।
আরাশ এলো দরজায়।
“বাবা।”
“হুম।”
“তুমি কি নিজেকে চেনো?”
থামলাম।
“কেন?”
“এমনি।”
“চিনি তো।”
“কেমন করে?”
ফোমওয়ালা মুখে আয়নায় তাকালাম।
“জানি না।”
সে চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ফোম শুকিয়ে যাচ্ছে।
বাইরে পাখি ডাকছে। সকাল হচ্ছে।
ব্লেড তুললাম। শুরু করলাম।
একটু একটু করে মুখ বেরিয়ে আসছে।
কোন মুখ—জানি না।
একটু ভাবনা রেখে যান