ব্লগ

দামের তালিকায় আমার আয়নার প্রতিবিম্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রেস্টুরেন্টের মেনু কার্ডটা হাতে ধরে আছি। একটা সাধারণ বিরিয়ানির দাম ৪৫০ টাকা। আমার হাত কাঁপল।

“৪৫০ টাকা!” আমি মনে মনে বললাম।

হ্যাপি আমার দিকে তাকাল। “কী হলো?”

“কিছু না,” আমি বললাম। কিন্তু মাথায় একটা হিসাব চলছে। ৪৫০ টাকায় আমি কত কেজি চাল কিনতে পারি? কত কেজি মাংস? কতদিনের বাজার?

আরাশ উৎসুক চোখে মেনু দেখছে। “বাবা, এই পিজ্জাটা ভালো লাগছে।”

আমি দামটা দেখলাম। ৮০০ টাকা।

আমার বুকের ভিতরে একটা কষ্ট চেপে বসল। ৮০০ টাকা! এই টাকায় হ্যাপি একটা মাস ভালো রান্na করতে পারবে।

কিন্তু আমি আরাশকে নিরাশ করতে চাই না। আজ তার জন্মদিন।

“ঠিক আছে,” আমি বললাম। “কিন্তু শুধু একটা।”

ওয়েটার এসে দাঁড়াল। আমি অর্ডার দিলাম। তিনজনের জন্য মোট ১৮০০ টাকা।

১৮০০ টাকা!

আমার মাসিক সেলারির প্রায় দশভাগের একভাগ। একটা খাবারে।

খাবার আসার পর আমি খেতে পারছি না। মুখে স্বাদ লাগছে না। আমার মনে হচ্ছে আমি টাকা খাচ্ছি। কাঁচা টাকা।

“বাবা, তুমি খাচ্ছ না কেন?” আরাশ জিজ্ঞেস করল।

“খাচ্ছি তো,” আমি বললাম। কিন্তু প্রতিটা চামচের সাথে একটা হিসাব আসছে। এই এক চামচের দাম ৫০ টাকা। আরেক চামচ ৫০ টাকা।

হ্যাপি আমার অবস্থা বুঝতে পেরেছে। “হায়দার, আজ আরাশের জন্মদিন। একটুদিন এই চিন্তা রাখো।”

কিন্তু পারছি না। আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি – আমাদের ছোট্ট রান্নাঘর। হ্যাপি সেখানে ভোর সকাল থেকে রান্না করে। আধা কেজি চাল, একটা মুরগি, কিছু সবজি দিয়ে চার-পাঁচজনের খাবার বানায়। খরচ সর্বোচ্চ তিনশো টাকা।

আর এখানে একজনের খাবার ছয়শো টাকা।

“এটা ঠিক না,” আমি নিজের সাথে বললাম।

কিন্তু পাশের টেবিলে একটা পরিবার বসে আছে। তারা খুশি মনে খাচ্ছে। কথা বলছে। হাসছে। তাদের মুখে কোনো চিন্তা নেই। দামের কোনো চিন্তা নেই।

“আমি কি গরিব?” আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম।

গরিব মানে কী? যার কাছে টাকা নেই? নাকি যে টাকার চিন্তা করে? আমার কাছে টাকা আছে। আমি এই খাবারের বিল দিতে পারব। কিন্তু আমি ভাবছি – এই টাকায় আর কী কী করতে পারতাম।

আরাশের স্কুলের বই কিনতে পারতাম। হ্যাপির একটা শাড়ি কিনে দিতে পারতাম। বাড়ির ভাড়া দিতে পারতাম।

“বাবা, তোমার কি ভালো লাগছে না?” আরাশের চোখে উদ্বেগ।

আমি মুখে হাসি এনে বললাম, “না না, খুব ভালো।”

কিন্তু সত্যি কথা হলো, খাবারটা সুস্বাদু। রান্নাও ভালো। কিন্তু আমি উপভোগ করতে পারছি না। কারণ আমার মাথায় ঘুরছে – এতো দামে! ঘরেই ভালো।

বিল পেমেন্ট করার সময় আমার হাত কাঁপল। ১৮০০ টাকা। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করলাম।

বাইরে বেরিয়ে আরাশ বলল, “বাবা, খুব মজা হলো।”

আমি আরাশের দিকে তাকালাম। তার মুখে একটা খুশি। সে উপভোগ করেছে।

হ্যাপি আমার হাত ধরল। “হায়দার, তুমি কেন এতো ভাবো?”

“কেন ভাবব না? ১৮০০ টাকায় আমি তোমাকে কতো ভালো কিছু কিনে দিতে পারতাম।”

“কিন্তু আজ আরাশের খুশি দেখলে না?”

আমি থমকে গেলাম। সত্যিই তো। আরাশ খুশি। এই খুশির দাম কত?

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবলাম – আমি কি ভুল করছি? আমার মনে হয় ঘরের খাবারই ভালো। সাশ্রয়ী। স্বাস্থ্যকর। কিন্তু আরাশের জন্মদিনে রেস্টুরেন্টে খাওয়াটা কি খারাপ?

“আমার সমস্যাটা কী?” আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।

সমস্যা হলো, আমি টাকার মূল্য জানি। আমি জানি কতো কষ্ট করে টাকা আসে। আমি জানি একটা চাকরি পাওয়া কতো কঠিন। আমি জানি মাসের শেষে টাকা শেষ হয়ে গেলে কী অবস্থা হয়।

কিন্তু যারা চিন্তা করে না, তারা কি ভুল? নাকি আমি ভুল?

ঘরে ফিরে রাতে শুয়ে ভাবলাম – রেস্টুরেন্টে খাওয়া কি শুধু খাবার খাওয়া? নাকি এটা একটা অভিজ্ঞতা? একটা পরিবারিক মুহূর্ত?

আমি হয়তো খরচের হিসাব করতে করতে আরাশের খুশিটা মিস করেছি। হ্যাপির আনন্দটা মিস করেছি।

কাল থেকে আরো সচেতন হবো। যখন পরিবারের সাথে সময় কাটাব, তখন হিসাবের বদলে মুহূর্তটাকে গুরুত্ব দেবো।

কিন্তু সত্যিই তো – ঘরের খাবারই ভালো। মায়ের হাতের রান্না, কোনো রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *