ব্লগ

আয়নার ভেতর আরেক আয়না

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে শেভ করতে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখে থমকে গেলাম। কবে থেকে এই চোখের নিচে এত কালি? কবে থেকে এই কপালে এত রেখা? আয়নাটা নির্দয়ভাবে সত্য বলে। কিন্তু আমার পকেটের স্মার্টফোনটাও তো একটা আয়না – সেটা কী দেখায়?

বাসে উঠে দেখি পাশের সিটের এক মানুষ তার মায়ের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছে। “মা, আমি ভালো আছি। তুমি ওষুধটা খেয়েছ তো?” পর্দার ওপাশ থেকে একটা বুড়ি মা হাসিমুখে হাত নাড়ছে। আমার ভিতরে কোনো অ্যাপ খুলে গেল যার নাম ‘হারানো’। আমার বাবা মারা গেছেন যখন আমার তেইশ বছর বয়স। যদি তখন এই যন্ত্রটা থাকত, আমি কি তাঁর শেষ কথাগুলো রেকর্ড করে রাখতে পারতাম?

অফিস থেকে ফিরে আরাশকে দেখি বারান্দায় বসে আছে। তার হাতে ট্যাব, কিন্তু সে রাস্তার দিকেও তাকাচ্ছে। আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী করছিস?”

“বাবা, আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছি।”

“কেমন এক্সপেরিমেন্ট?”

“দেখো, এই ইউটিউবে একটা ভিডিও আছে – ‘How people walk in different countries’। আমি সেটা দেখে তারপর আসল রাস্তার মানুষদের দেখছি। জানো বাবা, ভারতীয়রা হাঁটে এক রকম, জাপানিরা আরেক রকম। আর আমাদের এখানে মানুষ হাঁটে… এই দ্যাখো, ওই আন্টি হাঁটছে অন্য রকম।”

আমার ভিতরের পুরনো অ্যাপটা বন্ধ হয়ে নতুন একটা খুলল। নাম ‘বিস্ময়’। আমি ভাবছিলাম যন্ত্রটা আমাদের বাস্তব থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আরাশ তো যন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবকে আরও গভীরভাবে দেখছে। পর্দার আয়নায় পৃথিবীর মানুষ দেখে, তারপর জানালার আয়নায় নিজের পৃথিবীর মানুষ খুঁজে পাচ্ছে।

“তুই কী বুঝলি এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে?”

“বাবা, সবাই আলাদা কিন্তু কেউ একা না। জাপানে একজন দোকানে যাচ্ছে, এখানেও একজন দোকানে যাচ্ছে। দূরে থাকলেও আমরা একই কাজ করি।”

রাতে খাবার টেবিলে বসে ভাবছিলাম, আয়নার কথা। সকালের শেভিং আয়না আমার বয়স দেখিয়েছে। ফোনের আয়না অন্যের জীবন দেখিয়েছে। আরাশের ট্যাবের আয়না সমানতা দেখিয়েছে। হ্যাপির ফোনের আয়নায় তার বোনের বিয়ের ছবি – দূরত্ব সত্ত্বেও সে অংশগ্রহণ করতে পেরেছে। প্রতিটা আয়না ভিন্ন সত্য বলছে।

আমি যখন ছোট, বাবা বলতেন, “মানুষ সামাজিক জীব।” তখন বুঝতাম না। এখন বুঝি, এই যন্ত্রটা আমাদের সামাজিকতাকে অসীম করে দিয়েছে। একটা বুড়ি মা পর্দায় ছেলের মুখ দেখতে পান। একটা ছেলে পৃথিবীর মানুষ দেখে নিজের পৃথিবীকে আবিষ্কার করে। একটা স্ত্রী পাঁচশো মাইল দূরের বোনের আনন্দে অংশ নেয়।

কিন্তু আমি? আমি এই আয়নায় কী দেখি? নিজের একাকীত্ব। আমার চিন্তাগুলো কারো সাথে মেলে না। আমি ভাবি সততার কথা, অন্যরা ব্যবসার কথা। আমি ভাবি আল্লাহর কথা, অন্যরা টাকার কথা। এই স্মার্টফোন যুগে আমিই হয়তো সবচেয়ে ডিসকানেক্টেড মানুষ।

তাহলে সমস্যা কি যন্ত্রে, নাকি আমার মধ্যে? হয়তো এই আয়নাটা আমাকে সত্য দেখাচ্ছে – আমি যে একা। কিন্তু আরাশের মতো আমিও কি অন্যদের সাথে মিল খুঁজতে পারি না? বাসের সেই ছেলেটার মতো আমিও কি মায়ের সাথে কথা বলতে পারি না – যদিও মা নেই, আল্লাহ আছেন?

আজ রাতে বুঝলাম, স্মার্টফোন আমাদের স্মার্ট করেছে না নির্বোধ – এই প্রশ্নটাই ভুল। আসল প্রশ্ন হলো: আয়নায় যা দেখছি, সেটা গ্রহণ করতে পারি কি না। একাকীত্ব দেখে ভেঙে পড়ব, নাকি সেই একাকীত্বের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে কানেকশন খুঁজব?

আয়নার ভেতর আরেক আয়না আছে। সেখানে আমার প্রকৃত চেহারা লুকিয়ে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *