আজ সকালে আরাশকে দেখলাম বারান্দায় বসে আছে, কিন্তু রাস্তার দিকে তাকিয়ে নেই। মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। আমার গলাটা শুকিয়ে গেল। একটা অদ্ভুত কষ্ট বুকের ভিতরে চেপে বসল।
“আরাশ, কী দেখছিস?”
“গেম খেলছি বাবা।”
সে উত্তর দিল, কিন্তু চোখ তুলে তাকাল না। যে ছেলেটা একসময় রাস্তার প্রতিটি মানুষের গল্প বানাতো – ঐ যে লোকটা যাচ্ছে, ওর হয়তো বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রী আছে, তাই এতো তাড়াহুড়ো – সেই আরাশ আজ একটা কাচের টুকরোর দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
আমি নিজের দিকে তাকালাম। আমার হাতেও তো একটা ফোন আছে। কতক্ষণ ধরে স্ক্রল করছি ফেসবুকে? কতগুলো অর্থহীন পোস্টে রিয়েক্ট করলাম? কার কার জীবনের ভুয়া ছবি দেখে নিজেকে ছোট মনে করলাম?
হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বলল, “হায়দার, আমার সাথে কথা বলছ নাকি ফোনের সাথে?”
আমি চমকে উঠলাম। কখন থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে বসেছি, খেয়ালই নেই। আয়নার মতো স্ক্রিনে নিজের মুখ দেখতে পেলাম – চোখ লাল, মুখে একটা অন্যমনস্ক ভাব। এটাই কি আমার আসল মুখ? নাকি এটাও একটা মুখোশ?
“আমি বোকা হয়ে যাচ্ছি।”
কথাটা আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। হ্যাপি থমকে গেল।
“কেন এমন বলছ?”
“দেখ না, আমার কী অবস্থা। একসময় বই পড়তাম, চিন্তা করতাম। এখন? দশ সেকেন্ডের ভিডিও দেখে মগজ খুশি হয়। দুই লাইনের চেয়ে বেশি কিছু পড়তে গেলে মনোযোগ হারিয়ে ফেলি। আমার মস্তিষ্কটা যেন একটা ছেঁড়া পকেট – যা দিচ্ছি, সব পড়ে যাচ্ছে।”
আরাশ এবারে চোখ তুলল। “বাবা, তুমি বোকা না। তুমি অনেক কিছু জান।”
“কী জানি আরাশ? গুগল যা বলে, তাই জানি। আমার নিজের কোনো মত নেই। কোনো চিন্তা নেই। শুধু অন্যের চিন্তা পুনরাবৃত্তি করি।”
ছোটবেলায় বাবা বলতেন, “জ্ঞানী সেই, যে জানে যে সে কিছুই জানে না।” আমি তখন বুঝতাম না। এখন বুঝি। কিন্তু এখন আমি আরো খারাপ অবস্থায় – আমি জানি না যে আমি কিছুই জানি না। আমার মনে হয়, আমি সব জানি। ফেসবুকে দেখলাম, ইউটিউবে দেখলাম – মনে হয় বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছি।
স্মার্টফোনটা আমার হাতে ধরা। এটা আমাকে স্মার্ট করার কথা। কিন্তু আমি কেন মনে করছি এটা আমাকে বোকা বানাচ্ছে? প্রতিটি নোটিফিকেশন আমার চিন্তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। প্রতিটি লাইক আমার অহংকারে পানি ঢালে। প্রতিটি স্ক্রল আমার মনোযোগের গভীরতা কমিয়ে দেয়।
“আমার ভয় হচ্ছে আরাশ,” আমি বললাম। “তোর বয়সে আমি গল্পের বই পড়তাম। কল্পনা করতাম। তুই গেম খেলিস। তোর কল্পনার জায়গাটা কি ভরে যাচ্ছে অন্যের বানানো ছবিতে?”
আরাশ ফোনটা রেখে দিল। “বাবা, আমি তো এখনো বারান্দায় বসে মানুষ দেখি।”
“হ্যাঁ, কিন্তু কতক্ষণ? আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতিস। এখন পাঁচ মিনিট পরেই ফোন খুঁজিস।”
হ্যাপি এসে বসল আমাদের পাশে। “হায়দার, তুমি সবসময় এমনই চিন্তিত থাক। ফোন ভালো জিনিসও তো দেয়। আরাশ অনেক কিছু শিখছে।”
“কী শিখছে? তথ্য, নাকি জ্ঞান? তথ্য আর জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য আছে, হ্যাপি। তথ্য দেয় গুগল। জ্ঞান আসে চিন্তা করা থেকে, ভুল করা থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে।”
আমি আমার ছোটবেলার কথা ভাবলাম। সারাদিন খেলতাম। বই পড়তাম। স্বপ্ন দেখতাম। বড় হয়ে কী হব, সেই নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবতাম। এখন কী ভাবি? ভাবার সময়ই তো নেই। একটা ভিডিও দেখা শেষ, আরেকটা শুরু। একটা পোস্ট পড়া শেষ, আরেকটা পোস্ট।
“আল্লাহ কি চেয়েছিলেন আমরা এভাবে বাঁচি?”
কথাটা আমার মনের গভীর থেকে উঠে এল। হ্যাপি আমার দিকে তাকাল।
“কী মানে?”
“আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন মস্তিষ্ক, যাতে আমরা চিন্তা করি। তিনি দিয়েছেন হৃদয়, যাতে আমরা অনুভব করি। কিন্তু আমরা কী করছি? আমরা আমাদের মস্তিষ্ককে বানিয়ে ফেলেছি একটা গুদামঘর – যেখানে অন্যের চিন্তা জমা করি। আমাদের হৃদয়কে বানিয়ে ফেলেছি একটা লাইক-কাউন্টার।”
আরাশ বলল, “বাবা, তুমি কি ফোন ব্যবহার করবে না?”
আমি হেসে ফেললাম। “আরাশ, সমস্যা ফোনে নয়। সমস্যা আমার মধ্যে। আমি যন্ত্রটাকে ব্যবহার করার বদলে যন্ত্রটা আমাকে ব্যবহার করছে। আমি মনে করতাম আমি ফোনটা নিয়ন্ত্রণ করি। কিন্তু আসলে ফোনটাই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে।”
সূর্যটা পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। বারান্দা থেকে দেখতে পাচ্ছি রাস্তায় অনেক মানুষ হাঁটছে। প্রায় সবার হাতেই ফোন। কেউ কারো সাথে চোখাচোখি করছে না। কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। সবাই যেন অদৃশ্য সুতায় বাঁধা পুতুল।
“আমি কি এমনই দেখতে লাগি?” আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম।
হ্যাপি আমার হাত ধরল। “তুমি চিন্তা কর বলেই তো তুমি আলাদা।”
আমার চোখে পানি এসে গেল। হ্যাপি ঠিক কথা বলেছে। যারা চিন্তা করে না, তারা বুঝতেও পারে না যে তারা বোকা হয়ে যাচ্ছে। আমি অন্তত বুঝতে পারছি। কিন্তু বোঝার পরেও কি পারব থামতে? কাল সকালে উঠে কি আবার ফোনটা হাতে নেব না?
“বাবা,” আরাশ বলল, “চল আমরা কাল বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষ দেখি। ফোন ছাড়া।”
আমি আরাশের দিকে তাকালাম। এই ছেলেটা কি আমার চেয়ে বেশি জানে? হয়তো।
“চল,” আমি বললাম। “কিন্তু তুই পারবি?”
“তুমি পারলে আমিও পারব।”
রাত গভীর হয়ে এসেছে। আমি বিছানায় শুয়ে ভাবছি। স্মার্টফোনে বোকা হয়ে যাওয়ার হিসাব কী? সেকেন্ড দিয়ে? মিনিট দিয়ে? নাকি হারিয়ে যাওয়া কল্পনার পরিমাণ দিয়ে? নাকি না-পড়া বইয়ের সংখ্যা দিয়ে?
নাকি হিসাবটা এই যে, আমি যে মানুষটা হতে পারতাম, সেই মানুষটার সাথে আমার দূরত্ব কতটুকু?
আমার পাশে ফোনটা রাখা। এখনো কিছু নোটিফিকেশন জ্বলছে। কিন্তু আমি তাকাব না। আজ রাতে না। আজ রাতে আমি ভাবব। শুধু ভাবব। কোনো স্ক্রিন নয়, কোনো বিভ্রম নয়। শুধু আমি আর আমার চিন্তা।
হয়তো এভাবেই ফিরতে হয় নিজের কাছে। একটু একটু করে।
একটু ভাবনা রেখে যান