কথা

কোন আমি

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

প্রতিবিম্ব

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়াই। শেভিং ফোম লাগাই। ব্লেড চালাই। জল দিয়ে ধুই।

আরাশ দরজায় এসে দাঁড়ায়। পাঁচ বছর বয়স। চুল উসকোখুসকো।

“বাবা, তুমি খুব স্মার্ট লাগছ।”

আমি হাসি। মুখে এখনো ফোমের দাগ। তোয়ালে দিয়ে মুছি।

“তুমি কেন এত সময় নাও?” সে জিজ্ঞেস করে।

“কী জানি।”

“মা তো এত সময় নেয় না।”

“মা শেভ করে না।”

সে একটু ভাবে। তারপর চলে যায়।


অফিসে আমার ডেস্ক জানালার পাশে। বাইরে একটা কাক বসে থাকে রোজ। একই জায়গায়। একই সময়ে। আমি ভাবি, সে কি আমাকে চেনে?

মিটিং হয়। কথা বলি। মাথা নাড়ি। নোট নিই।

সাইফুল পাশে বসে। ফিসফিস করে বলে, “তুই ঘুমাচ্ছিলি নাকি?”

“না।”

“তোর চোখ বন্ধ ছিল।”

“ভাবছিলাম।”

“কী?”

জানালার বাইরে তাকাই। কাকটা নেই।

“কিছু না।”


২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে দিলাম। মা তখনো বেঁচে।

“কেন ছাড়লি?” মা জিজ্ঞেস করেছিল।

“ভালো লাগছিল না।”

“ভালো লাগা দিয়ে সংসার চলে?”

চুপ করে ছিলাম।

মা রান্নাঘরে গেলেন। পেঁয়াজ কাটার শব্দ এলো। তারপর থেমে গেল।

“চা খাবি?”

“হ্যাঁ।”

চা আনলেন। দুধ কম দিয়েছিলেন। আমি কিছু বললাম না।


বাবা মারা যাওয়ার দিন বৃষ্টি হচ্ছিল। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। জল পড়ছিল। নিচে জমছিল। আবার পড়ছিল।

কেউ একজন কাঁধে হাত রাখল। ফিরে তাকালাম না। জানতাম কে।

হ্যাপি বলল, “চলো।”

“একটু দাঁড়াও।”

“ঠান্ডা লাগবে।”

“লাগুক।”

সে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। বৃষ্টি থামল না।


আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “দাদু কোথায়?”

“নেই।”

“মানে?”

“মানে… চলে গেছেন।”

“কোথায়?”

জানালার বাইরে তাকালাম। আকাশ ধূসর।

“জানি না।”

সে আমার কোলে উঠে এলো। কিছু বলল না। আমিও বললাম না।

তার চুলে নারকেল তেলের গন্ধ। হ্যাপি সকালে মাথায় দিয়েছিল।


রাতে হ্যাপির পাশে শুয়ে থাকি। সে ঘুমিয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি। আমি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি।

ফ্যান ঘোরে। ছায়া নড়ে।

কখনো কখনো ভাবি, এই যে পাশে শুয়ে আছি—এটা কি আমি? নাকি অন্য কেউ যে আমার জায়গায় এসে গেছে?

হ্যাপি ঘুমের মধ্যে কিছু বলে। বুঝি না কী।


গত মাসে রাস্তায় হাঁটছিলাম। থমকে গেলাম।

পিঁপড়ের সারি। ফুটপাথ ধরে যাচ্ছে। এক লাইনে। কেউ এদিক-ওদিক যাচ্ছে না।

বসে পড়লাম। মানুষ পাশ দিয়ে যাচ্ছে। আমি দেখছি।

একটা পিঁপড়ে থেমে গেল। ঘুরল। আবার চলল।

কতক্ষণ বসেছিলাম জানি না। ফোন বাজল।

হ্যাপি।

“কোথায় তুমি?”

“রাস্তায়।”

“কী করছ?”

চুপ করে রইলাম।

“হ্যালো?”

“আসছি।”


বাবু ফোন করল। মামাতো ভাই। ঢাকায় এসেছে।

“দেখা করবি?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায়?”

“যেখানে বলিস।”

আমরা পুরান ঢাকায় গেলাম। একটা চায়ের দোকান। প্লাস্টিকের চেয়ার। টেবিলে ধুলো।

বাবু বলল, “তুই বদলে গেছিস।”

“কীভাবে?”

“আগে এত চুপচাপ ছিলি না।”

চা এলো। কাপে চিড় ধরা। চুমুক দিলাম। খুব মিষ্টি।

“চুপচাপই ছিলাম।”

“না। তুই হাসতিস বেশি।”


মা মারা যাওয়ার পর ঘরটা খালি লাগে।

একদিন গেলাম। চাবি দিয়ে দরজা খুললাম। ভেতরে ঢুকলাম।

সবকিছু আছে। চেয়ার, টেবিল, আলমারি। মায়ের শাড়ি এখনো তারে ঝোলানো। ধুলো পড়েছে।

জানালা খুললাম। বাতাস এলো। পর্দা নড়ল।

রান্নাঘরে গেলাম। চুলার পাশে লবণের কৌটা। মা এখানে দাঁড়াতেন। পেঁয়াজ কাটতেন। চা বানাতেন।

কৌটাটা তুলে নিলাম। হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

ফোন বাজল। রাখলাম না। বাজতে দিলাম।


সুলতান বলে, “তোর সমস্যা কী?”

“সমস্যা?”

“হ্যাঁ। তুই কিছু একটা ভাবছিস সারাক্ষণ।”

“সবাই তো ভাবে।”

“এভাবে না।”

আমরা ছাদে বসে আছি। সন্ধ্যা। মশা উড়ছে। দূরে আজান হচ্ছে।

“এভাবে মানে?”

“তুই আছিস, কিন্তু নেই।”

চুপ করে রইলাম।

“কী চিন্তা করিস?”

“জানি না।”

সে সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া উপরে উঠে গেল।


আরাশ আঁকতে ভালোবাসে। একদিন এনে দেখাল।

“এটা কী?”

“আমাদের বাসা।”

দেখলাম। একটা বাক্স। তার ভেতর চারটা মানুষ। এক কোণায় একটা গাছ।

“এটা কে?”

“তুমি।”

আমি সবার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে। একা।

“আমি এখানে কেন?”

“তুমি তো জানালার পাশে দাঁড়াও সবসময়।”

ছবিটা হাতে নিলাম। অনেকক্ষণ দেখলাম।


একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি হ্যাপি রান্নাঘরে।

“কী হয়েছে?”

“কিছু না।”

ঢুকলাম। সে পেঁয়াজ কাটছে। চোখ লাল।

“কাঁদছ?”

“পেঁয়াজ।”

বসলাম। সে কাটতে থাকল।

“তুমি কি সুখী?” সে জিজ্ঞেস করল। আমার দিকে না তাকিয়ে।

“জানি না।”

ছুরির শব্দ। কট কট কট।

“আমি?”

“তুমি কি সুখী?”

“জানি না।”


আয়নায় তাকাই। মুখটা চেনা। চোখ, নাক, ঠোঁট—সব আছে।

কিন্তু ভেতরে কে?

প্রশ্নটা মাথায় আসে। উত্তর আসে না।


আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি আমাকে চেনো?”

“চিনি তো।”

“আচ্ছা, তুমি কি নিজেকে চেনো?”

থমকে গেলাম।

“কেন জিজ্ঞেস করছ?”

“এমনি।”

সে খেলতে চলে গেল। আমি বসে রইলাম।


রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি।

আমি কে ছিলাম? আমি কে আছি?

প্রশ্নগুলো ঘোরে। ঘুম আসে না।

হ্যাপি পাশ ফিরল। তার হাত আমার হাতের কাছে এলো। স্পর্শ করল না।


সকালে আবার আয়না। আবার সেই মুখ।

আরাশ এলো।

“বাবা।”

“হুম।”

“তুমি কি জানো তুমি কে?”

“জানি না।”

সে একটু ভাবল।

“কেউ জানে?”

“হয়তো না।”

“তাহলে?”

ফোমের কৌটা তুলে নিলাম। ঢাকনা খুললাম।

“তাহলে কিছু না। এমনিই।”

সে চলে গেল।

আমি আয়নায় তাকিয়ে রইলাম। প্রতিবিম্ব তাকিয়ে রইল।

বাইরে রোদ উঠছে। জানালার কাচে আলো পড়ছে।

কোথাও একটা কাক ডাকছে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

কথা

স্যার

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

কথা

বহুরূপ

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *