টিভি পর্দায় লাইন পড়ছে। আওয়াজ আসছে না। কিংবা ছবি ঝাপসা। যে সমস্যাই হোক, বাবা বলতেন একই কথা – “অফ কর। তারপর অন কর।” এবং অবিশ্বাস্য ব্যাপার হল, ৭০% সময়ে এই সমাধান কাজ করত।
আজ আমাদের টিভিতে সমস্যা। আরাশ বলছে, “আব্বু, টিভিতে ছবি আসছে না।” আমার মুখ দিয়ে অটোমেটিক বেরিয়ে এল, “অফ কর। তারপর অন কর।” হ্যাপি পাশ থেকে হেসে বলল, “তুমি তোমার বাবার মতো কথা বলছ।”
বাবার যুগে টিভি ছিল এক রহস্যময় যন্ত্র। কেবল সংযোগ ছিল না। সাধারণ অ্যান্টেনা। মাঝে মাঝে আবহাওয়ার কারণে সিগন্যাল যেত। কিন্তু বাবা কখনো টেকনিশিয়ান ডাকতেন না। নিজেই চেষ্টা করতেন। প্রথম চেষ্টা সবসময় – অফ করা, অন করা।
“এই যন্ত্রগুলোর মাথা আছে,” বাবা বলতেন। “মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে। একটু ঝাঁকুনি দিলে জেগে ওঠে।” এই দর্শনটা আমার মনে গেঁথে গেছে। যন্ত্র শুধু যন্ত্র নয়, এদেরও আত্মা আছে।
রেডিওতে স্ট্যাটিক হলে বাবা বলতেন, “অফ কর।” ফ্যান না ঘুরলে “অফ কর।” এমনকি ঘড়ি থেমে গেলেও তিনি বলতেন, “ব্যাটারি খুলে আবার লাগা।” এটাও এক ধরনের অফ-অন।
আমার ছোটবেলায় কম্পিউটার আসল। সেটাও হ্যাং করত। বাবা বলতেন, “রিস্টার্ট দে।” আমি বলতাম, “বাবা, এটা ভাইরাস।” তিনি বলতেন, “আগে রিস্টার্ট দে। দেখি কী হয়।”
বাবার এই সহজ সমাধান দেখে মনে হত তিনি কিছু জানেন না। কিন্তু আজ বুঝি, তিনি যন্ত্রের মূল নীতিটা বুঝেছিলেন। অধিকাংশ ইলেকট্রনিক সমস্যা temporary। রিস্টার্ট করলে সিস্টেম ক্লিয়ার হয়ে যায়।
এখন আমার অফিসে কম্পিউটার সমস্যা হলে আইটি সাপোর্ট প্রথমেই যে কথা বলে – “রিস্টার্ট করে দেখুন।” বাবার সেই পুরনো পদ্ধতি এখনো প্রাসঙ্গিক।
আরাশকে শেখাচ্ছি একই জিনিস। তার ট্যাবলেট ঝুলে গেলে বলি, “অফ কর। অন কর।” সে বলে, “কেন?” আমি বাবার কথা বলি, “যন্ত্রের মাথা থাকে। মাঝে মাঝে বিশ্রাম দিতে হয়।”
কিন্তু শুধু যন্ত্রের জন্য নয়, বাবার এই দর্শন জীবনেও প্রযোজ্য। মানুষও মাঝে মাঝে “হ্যাং” হয়ে যায়। তখন দরকার হয় একটু বিশ্রাম। একটু “অফ” হওয়া। তারপর নতুন উদ্যমে “অন” হওয়া।
আল্লাহর কাছে মনে হয় বাবার এই সহজ সমাধানে একটা গভীর সত্য ছিল। জটিলতার মধ্যেও সরল পথ খুঁজে বের করা। সব সমস্যার একই উত্তর না হলেও, প্রথমে সরল সমাধান চেষ্টা করা।
আজ আরাশ টিভি অফ-অন করে দেখল। কাজ হল। সে অবাক হয়ে বলল, “সত্যিই হয়ে গেছে!” আমি হাসলাম। বাবার আত্মা হয়তো খুশি হলেন।
হ্যাপি বলল, “এই পদ্ধতি সবসময় কাজ করে না।” আমি বলি, “কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে খারাপ কী?” এবং সত্যি, অনেকবার কাজ করে।
এখনো যখন কোনো গ্যাজেট সমস্যা করে, আমার প্রথম প্রবৃত্তি হয় বাবার কথা। “অফ কর। অন কর।” এই সহজ মন্ত্রটা আমার রক্তে মিশে গেছে।
এবং মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনের অনেক জটিল সমস্যারও এই একই সমাধান। কিছু সময়ের জন্য “অফ” হওয়া। তারপর নতুন করে “অন” হওয়া। শুরু করা।
বাবার এই সরল দর্শন আমি আমার সন্তানের কাছে পৌঁছে দেব। যন্ত্রের সমস্যায় বিচলিত না হয়ে প্রথমে সহজ সমাধান খোঁজা। হয়তো সেটাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
একটু ভাবনা রেখে যান