একজন বাবার কষ্টের গল্প যেখানে ফুটে উঠেছে মধ্যবিত্তের হাহাকার। এই ছবিতে দারিদ্র্যের কষাঘাত আর বাবার নীরব ত্যাগ দৃশ্যমান, যা জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

জীবন

উপোস

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার
একজন বাবার কষ্টের গল্প যেখানে ফুটে উঠেছে মধ্যবিত্তের হাহাকার। এই ছবিতে দারিদ্র্যের কষাঘাত আর বাবার নীরব ত্যাগ দৃশ্যমান, যা জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
এটা ত্যাগ না। এটা অসহায়তা।

ছেলের কোচিং ফি ৩০০০ টাকা। দিতে হবে আগামীকাল।

কাছে আছে ২৫০০। আরও ৫০০ দরকার।

খাবারের হিসাব করি।

দুপুরে ৮০ টাকা। সকালে ২০। সন্ধ্যায় ৩০।

দৈনিক ১৩০। মাসে ৩৯০০।

সিদ্ধান্ত নিই। অর্ধেক করব।

দুপুরে খাব না। বাড়ি ফিরে খাব। সকালে নাশতা না। সন্ধ্যায় চা না।

মাসে ১৯৫০ টাকা বাঁচবে।

প্রথম দিন দুপুরে বসে থাকি। পেট খালি।

সহকর্মী বলে, খাবে না?

ভুখ নেই।

মিথ্যা। প্রচণ্ড খিদে। কিন্তু খেতে পারি না।

বিকাল চারটায় পেটে ব্যথা। খিদের ব্যথা।

পানি খাই। কিছুটা কমে।

বাড়ি ফিরে স্ত্রী খাবার দেয়।

গোগ্রাসে খাই। সে অবাক।

এত তাড়াতাড়ি কেন?

খুব খিদে লেগেছিল।

সত্য। সারাদিন না খেয়ে।

দ্বিতীয় দিনও একই। তৃতীয় দিনও।

চতুর্থ দিন মাথা ঘুরে। দুর্বলতায় বসে থাকতে পারি না।

কিন্তু থাকতে হয়।

পনেরো দিন পর কোচিং ফি দিই।

স্যার বলেন, আপনার ছেলে মেধাবী। ভালো ফলাফল করবে।

হাসি। কিন্তু ভিতরে জানি, এই ফলাফলের জন্য কত ত্যাগ।

ছেলে জানে না তার কোচিং ফি জোগাতে বাবা দুপুরে খায় না।

মনে করি না কিছু।

ছেলের ভবিষ্যতের জন্য বাবার উপোস পুণ্যের কাজ।

কিন্তু সত্যিই কি?

পুণ্য? নাকি লজ্জা?

যে দেশে বাবাকে উপোস করতে হয় ছেলের শিক্ষার জন্য—

সেই দেশ কোন দেশ?

যে সমাজে এটা “ত্যাগ” বলে গর্ব করা হয়—

সেই সমাজ কোন সমাজ?

আমি গর্বিত? নাকি লজ্জিত?

জানি না। শুধু জানি—ক্ষুধার্ত।

এই ছেলেও একদিন বাবা হবে। তার ছেলের কোচিং ফি জোগাতে সে-ও উপোস করবে।

তখন সে-ও ভাববে—এটা পুণ্য।

এটা ভালোবাসা।

কিন্তু এটা আসলে কী?

একটা চক্র।

দরিদ্রতার চক্র।

বাবা উপোস করে। ছেলে পড়ে। ছেলে বড় হয়। বাবা হয়। তার ছেলের জন্য উপোস করে।

কোথায় শেষ?

নেই।

আমি যখন উপোস করছি, তখন কি ভাবছি—এটা ঠিক?

না।

ভাবছি—এটা দরকার।

কিন্তু কেন দরকার?

কারণ টাকা নেই।

টাকা কেন নেই?

কারণ আয় কম।

আয় কেন কম?

কারণ… কারণ… কারণ…

প্রশ্ন শেষ হয় না।

শুধু উপোস চলতে থাকে।

স্ত্রী জানে না। ছেলে জানে না।

শুধু আমি জানি।

আর আমার পেট জানে।

রাতে ঘুমাতে যাই। পেট ডাকে। খিদে লাগে।

কিন্তু উঠি না। কারণ রান্না নেই।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে বলব, ভুখ নেই।

আবার মিথ্যা।

মিথ্যার পর মিথ্যা।

আমার জীবন কি শুধু মিথ্যা?

হয়তো।

কিন্তু এই মিথ্যা ছাড়া চলে কীভাবে?

সত্য বললে কী হবে?

বলব স্ত্রীকে—আমি ক্ষুধার্ত কিন্তু খেতে পারছি না?

বলব ছেলেকে—তোর শিক্ষার জন্য আমি না খেয়ে থাকি?

এই সত্য তারা সহ্য করবে?

আমি সহ্য করতে পারব?

না।

তাই মিথ্যা বলি।

তাই হাসি।

তাই গর্ব করি—আমি ত্যাগ করছি।

কিন্তু গভীরে জানি।

এটা ত্যাগ না।

এটা অসহায়তা।

আমার কাছে কোনো অপশন নেই।

না খেয়ে থাকা ছাড়া।

এটা “বেছে নেওয়া” না।

এটা বাধ্য হওয়া।

কিন্তু কাকে বলব?

কে শুনবে?

সবাই বলবে—তুমি দায়িত্বশীল বাবা।

ছেলের জন্য ত্যাগ করছ।

আর আমি মাথা নেড়ে রাজি হব।

কারণ এই ছাড়া আর কী করব?

কান্নাকাটি?

রাগ?

বিদ্রোহ?

কার বিরুদ্ধে?

সিস্টেমের বিরুদ্ধে?

সিস্টেম তো আমাকে চেনেই না।

আমি একটা নম্বর।

একটা ফাইল।

একটা পেটের মধ্যে খিদে।

আর কিছু না।

ছেলে বড় হবে। হয়তো ভালো চাকরি পাবে।

তখন সে আমার জন্য খাবার কিনবে।

বলবে—বাবা, তুমি আমার জন্য এত করেছ।

আমি গর্বিত হব।

কিন্তু সেই গর্ব—

সেটাও কি মিথ্যা না?

কারণ সেই গর্বের ভিত্তি—

একজন মানুষের উপোস।

একজন বাবার ক্ষুধা।

এটা কী ধরনের সভ্যতা?

যেখানে উপোস পুণ্য হয়?

যেখানে না খেয়ে থাকা গর্বের বিষয়?

জানি না।

শুধু জানি—আগামীকাল আবার দুপুরে খাব না।

কারণ ছেলের বই কিনতে হবে।

আবার উপোস।

আবার মিথ্যা।

আবার হাসি।

এই চক্র।

এই জীবন।

এই “ভালোবাসা”।

অনুভূতি গল্প নীরবতা পরিবার বাস্তবতা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *