সকাল ৬:৩০ – জাগরণের মৃত্যুঘণ্টি
অ্যালার্মের আওয়াজ। প্রতিদিনের মতো। একই সুর, একই সময়, একই যন্ত্রণা। আমি চোখ খুলি, কিন্তু জাগি না। জাগার জন্য আত্মা লাগে। আত্মা আমার সেই পুরনো ড্রয়ারে বন্দী, যেখানে রাখা আছে ভাঙা ঘড়ি আর অসমাপ্ত কবিতার খাতা।
হ্যাপি পাশে ঘুমিয়ে। ওর মুখে নিশ্চিন্তের ছাপ। আমি ভাবি – ও কি জানে আমি প্রতিদিন মরে যাই এই সময়টায়? ও কি জানে সকাল ৬:৩০ মানে হায়দারের মৃত্যু, “অফিস কর্মচারী”র জন্ম?
আমার বাল্যকালের সত্তা, স্মৃতির গভীর থেকে প্রশ্ন করে: “তুমি কি মনে রাখো সেই সকাল যখন তুমি পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত?”
বর্তমান আমার উত্তর: “পাখিরা এখনো ডাকে। কিন্তু আমি শুনি না। আমি শুনি অ্যালার্ম।”
সকাল ৭:০০ – পোশাকে রূপান্তর
শার্ট-প্যান্ট। প্রতিদিনের উর্দি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি একজন অচেনা মানুষ। এ আমি নই। এ একটা কর্পোরেট ভুতুড়ে।
টাই বাঁধছি। মনে হচ্ছে গলায় ফাঁস দিচ্ছি। আস্তে আস্তে। নিজের হাতেই।
ফ্রাঞ্জ কাফকার কণ্ঠ, দ্য ট্রায়াল থেকে: “সকাল সকাল গেছিলেন আরেস্ট করতে কাউকে না জানিয়ে।”
আমার মনোলোগ: “আমাকেও গ্রেফতার করেছে। অভিযোগ – জীবন্ত থাকা।”
আরাশ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। ওকে দেখে মনে হয় – ও কি বুঝতে পারে আমি কোথায় যাচ্ছি? ও কি জানে আমি ফিরব অন্য মানুষ হয়ে?
সকাল ৮:০০ – যাত্রা শুরু
বাসে উঠি। চারপাশে আরো হাজারো মানুষ। সবার মুখ একই রকম। জীবন্ত লাশের মিছিল।
পাশের আসনের ভদ্রলোকের সাথে চোখাচোখি। তিনিও হয়তো ভাবছেন একই কথা।
আমাদের দুজনের অনস্পোকেন কথোপকথন: “আমরা কোথায় যাচ্ছি?” “অফিসে।” “কেন?” “বেঁচে থাকার জন্য।” “এটা কি বেঁচে থাকা?” “…”
বাসের জানালা দিয়ে দেখি ছোট্ট একটা মেয়ে খেলছে। ওর মুখে হাসি। প্রাণবন্ত। জীবিত। আমি ভাবি – আমার কবে এই হাসি হারিয়ে গেল?
প্রুস্তের কণ্ঠ, ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম থেকে: “হারানো সময়ের খোঁজে আমরা সবাই।”
আমার চিৎকার, মনের ভেতর: “আমি হারিয়েছি বর্তমান সময়। ভবিষ্যৎ আর অতীত নিয়ে কী করব?”
সকাল ৯:০০ – কারাগারে প্রবেশ
অফিস বিল্ডিং। তিরিশ তলা। আমি পনেরো তলায়। মাঝামাঝি। নরকেও নই, স্বর্গেও নই। লিম্বোতে।
লিফটে উঠতে গিয়ে দেখি অনেকগুলো মুখ। চিনি, অথচ চিনি না।
করিম ভাইয়ের সাথে কথোপকথন: “কেমন আছেন?” “ভালো। আপনি?” “ভালো।”
আমাদের দুজনেই জানি – আমরা মিথ্যা বলছি। কিন্তু সত্য বলার ভাষা আমরা ভুলে গেছি।
সকাল ৯:১৫ – ডেস্কে মৃত্যু
আমার টেবিল। আমার চেয়ার। আমার কম্পিউটার। এইখানে আমি রোজ ৮ ঘণ্টা বিতায়। জীবনের এক-তৃতীয়াংশ।
গাণিতিক হিসাব, আমার মনে: ৪০ বছর কর্মজীবন × ৮ ঘণ্টা × ২৫০ দিন = ৮০,০০০ ঘণ্টা ৮০,০০০ ঘণ্টা = ৯ বছর ২ মাস আমি আমার জীবনের ৯ বছর ২ মাস এই চেয়ারে বসে থাকব।
সার্ত্রের কণ্ঠ, বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস থেকে: “মানুষ স্বাধীনতার জন্য অভিশপ্ত।”
আমার প্রত্যুত্তর: “আমি গোলামির জন্য অভিশপ্ত।”
কম্পিউটার অন করি। এক্সেল ফাইল খুলি। সংখ্যার জগৎ। এখানে আমি সংখ্যা, মানুষ নই।
এমপ্লয়ি আইডি: ১০৭৮৫ বেতন কোড: জিএস-১২
ডেস্ক নম্বর: পিডি-১৫-০৮
আমার কোনো নাম নেই। আছে কোড।
দুপুর ১২:৩০ – লাঞ্চ ব্রেক: স্বাধীনতার ভ্রম
৩০ মিনিটের বিরতি। কাগজে লেখা “লাঞ্চ ব্রেক”। আমি এটাকে বলি “জীবন ব্রেক”।
ছাদে উঠি। আকাশ দেখি। মেঘ আছে। সূর্য আছে। পাখি আছে। পৃথিবী এখনো আছে। কিন্তু আমি?
৩০ মিনিটের মধ্যে আমি চেষ্টা করি:
- নিজেকে মনে করিয়ে দিতে আমি কে
- সূর্যের আলো গায়ে মাখতে
- একটা গভীর নিঃশ্বাস নিতে
- হ্যাপি আর আরাশের কথা ভাবতে
কিন্তু ৩০ মিনিট যথেষ্ট নয় একটা মৃত আত্মাকে জীবিত করতে।
ফোনে হ্যাপির মেসেজ: “রাতে কী রান্না করব?”
আমি উত্তর দিই: “যা ইচ্ছা।”
কিন্তু আমি বলতে চেয়েছিলাম: “রান্না কোরো আমার হারিয়ে যাওয়া জীবন। আমার স্বপ্ন। আমার হাসি।”
বিকেল ৫:৩০ – মুক্তির সময়?
অফিস টাইম শেষ। কিন্তু মুক্তি নেই। কারণ যে মানুষটা বাড়ি ফিরবে, সে আর আমি নই। সে একটা ক্লান্ত, হতাশ, নিষ্প্রাণ যন্ত্র।
বাড়ি ফেরার পথে বাসে বসে ভাবি: “আমি কি আজ কিছু অর্জন করেছি? আমি কি আজ কারো উপকার করেছি? আমি কি আজ নিজের মতো করে কিছু করেছি?”
উত্তর: না, না, না।
সন্ধ্যা ৭:০০ – ঘরে ফেরা অচেনা মানুষ
বাড়ি পৌঁছাই। আরাশ দৌড়ে আসে। “বাবা এসেছে!”
কিন্তু বাবা আসেনি। এসেছে বাবার ছায়া। বাবার লাশ। বাবার অবশিষ্টাংশ।
হ্যাপি জিজ্ঞেস করে: “কেমন কাটল দিন?”
আমি বলি: “ভালো।”
আমি বলতে চেয়েছিলাম: “আমি আজ মরেছি একবার। সকালে মরেছি, সন্ধ্যায় ফিরেছি। প্রতিদিন এক একটা মৃত্যু। প্রতিদিন এক একটা পুনর্জন্ম। কিন্তু পুনর্জন্মে আমি আগের চেয়ে কম জীবিত।”
রাত ১০:০০ – নিদ্রাহীনতার ভেতর জাগরণ
শুয়ে আছি। ঘুম আসে না। কারণ ঘুমাতে গেলে আবার সকাল হবে। আবার অ্যালার্ম। আবার সেই একই চক্র।
আমার ভেতরের কবি, দীর্ঘদিন বন্দী, হঠাৎ কথা বলে উঠে:
“আমি একটি চাকা প্রতিদিন ঘুরি একই জায়গায় কিন্তু কোথাও পৌঁছাই না।
আমি একটি ঘড়ি সময় দিই সবাইকে কিন্তু আমার নিজের সময় নেই।
আমি একটি মানুষ অথচ মানুষত্ব হারিয়েছি।”
চেতনার গভীর থেকে প্রশ্ন উঠে আসে: “কতদিন আর? কত বছর আর এই রুটিন? কবে মুক্তি?”
উত্তর ভেসে আসে নিস্তব্ধতা থেকে: “মুক্তি আসবে না। মুক্তি নিতে হয়।”
রাত ২:০০ – বিপ্লবের সূত্রপাত
হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিই। আমি একটা ডায়েরি খুলি। লিখতে শুরু করি:
“আমার মুক্তির পরিকল্পনা:
১. প্রতিদিন সকালে ৫ মিনিট নিজের সাথে কথা বলব ২. অফিসে ১৫ মিনিট নিজের কাজ করব (কবিতা/গল্প)
৩. লাঞ্চ টাইমে ৫ মিনিট মেডিটেশন ৪. প্রতিদিন আরাশকে ১০ মিনিট গল্প বলব ৫. হ্যাপির সাথে ১৫ মিনিট সত্যিকারের কথা বলব
মোট সময়: ৫০ মিনিট/দিন বছরে: ৩০৪ ঘণ্টা
৩০৪ ঘণ্টা = আমার হারিয়ে যাওয়া জীবনের ১২.৫ দিন
প্রতি বছর আমি ১২.৫ দিন নিজেকে ফেরত পাব।”*
ভোর ৫:০০ – নতুন জাগরণ
আজ অ্যালার্মের আগেই উঠেছি। নিজের ইচ্ছায়। ব্যালকনিয়ে দাঁড়িয়ে দেখি সূর্যোদয়।
আজ আমার ৫ মিনিট নিজের সাথে: “হায়দার, তুমি এখনো আছো। তুমি হারিয়ে যাওনি। তুমি শুধু লুকিয়ে আছো। আজ থেকে তোমাকে খোঁজা শুরু।”
হ্যাপি উঠে এসেছে। “আজ তাড়াতাড়ি উঠেছ কেন?”
আমি প্রথমবারের মতো সত্য বলি: “নিজেকে খুঁজে পেতে।”
ও হাসে। “পেয়েছ?”
“শুরু করেছি।”
আমার নতুন সূত্র:
৯ টা ৫ টার রুটিনে হারিয়ে গেলে, ৫ মিনিট ৫ মিনিট করে নিজেকে ফিরে পেতে হয়।
রুটিন ভাঙতে হয় রুটিন দিয়েই। ভালো রুটিন দিয়ে।
এবং এই লাইনটি আমার নতুন ম্যান্ত্রা:
“আমি একটি ঘড়ি নই। আমি সময়ের মালিক।”
আজ অফিসে যাব। কিন্তু আজ আমি যাব। কেবল “অফিস কর্মচারী” নয়।
হায়দার যাবে। কবিতা লেখা হায়দার। স্বপ্ন দেখা হায়দার। ভালোবাসা হায়দার।
রুটিনের বিরুদ্ধে বিপ্লব শুরু। আজ থেকে।
একটু ভাবনা রেখে যান