ব্লগ

কালের বাইরের দর্শক

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। অজ্ঞান। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি সব কিছু।

উপরে ভাসতে ভাসতে নিজের শরীরটাকে দেখছি। হ্যাপি কাঁদছে। আরাশ আমার হাত ধরে আছে। ডাক্তার কী যেন বলছেন।

কিন্তু আমার কোনো তাড়াহুড়া নেই। কারণ আমি এখন সময়ের বাইরে।

এই অবস্থান থেকে দেখছি আমার পুরো জীবন একসাথে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ – সব কিছু একটা ছবির মতো ছড়িয়ে আছে।

দেখছি পাঁচ বছর বয়সে আমি মায়ের কোলে কাঁদছি। সেই কান্না এখনো শোনা যাচ্ছে।

দেখছি পঁচিশ বছর বয়সে হ্যাপিকে প্রথম “ভালোবাসি” বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু মুখ দিয়ে বের হয়েছিল “তুমি…” – তারপর আর কিছু না।

দেখছি ত্রিশ বছর বয়সে আরাশ জন্মেছে। আমি তাকে প্রথম কোলে নিয়ে কাঁদছি। খুশিতে নাকি ভয়ে জানি না।

দেখছি চল্লিশ বছর বয়সে অফিসে চাকরি হারানোর দিন। সাহেব বলছেন “আপনার দরকার নেই।” আমি নিরবে বেরিয়ে যাচ্ছি।

দেখছি পঞ্চাশ বছর বয়সে হ্যাপি অসুস্থ। আমি তার পাশে বসে আছি। কিছু বলতে পারছি না। কিন্তু হাত ধরে আছি।

সব কিছু একসাথে দেখতে পাচ্ছি। আর বুঝতে পারছি এই জীবনের প্যাটার্ন।

আমি সব সময়ই কিছু না কিছু বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বলতে পারিনি।

পাঁচ বছর বয়সে বলতে চেয়েছি “মা, আমি ভয় পাই।” বলেছি “মা।”

পনেরো বছর বয়সে বলতে চেয়েছি “আমি অন্যদের মতো নই।” বলেছি “আমি ঠিক আছি।”

পঁচিশে বলতে চেয়েছি “তুমি আমার জীবনের সব কিছু।” বলেছি “তুমি ভালো।”

পঁয়ত্রিশে বলতে চেয়েছি “আরাশ, বাবা তোমার জন্য সব করতে পারে।” বলেছি “পড়া কর।”

আর এখন পঁয়তাল্লিশে, মৃত্যুর মুখে, আমি কিছুই বলতে পারছি না।

কিন্তু সময়ের বাইরে থেকে দেখতে পাচ্ছি যে, আমি আসলে অনেক কিছু বলেছি।

আমার নীরবতা একটা ভাষা ছিল।

আমার কাঁদা একটা কবিতা ছিল।

আমার হাত ধরা একটা প্রেমপত্র ছিল।

হ্যাপি কখনো জানবে না যে আমি প্রতিদিন তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে কত কবিতা লিখেছি।

আরাশ কখনো জানবে না যে আমি প্রতি রাতে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি।

কিন্তু সময়ের বাইরে থেকে দেখছি সেই কবিতাগুলো আসলে তাদের কাছে পৌঁছেছিল।

হ্যাপি যখন আমার জন্য চা বানাত, তখন সে আসলে আমার অলিখিত ভালোবাসার উত্তর দিত।

আরাশ যখন আমার পাশে এসে বসত, তখন সে আসলে আমার নিঃশব্দ স্বপ্নের সাথি হতো।

আমি ভাবতাম আমি কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি। কিন্তু দেখছি যোগাযোগ হয়েছিল অন্যভাবে।

সময়ের ভেতর থেকে আমি দেখতে পাইনি। কিন্তু সময়ের বাইরে থেকে সব পরিষ্কার।

আমার জীবন ব্যর্থতার জীবন নয়। এটা অন্যরকম সফলতার জীবন।

আমি বলতে পারিনি, কিন্তু ভালোবেসেছি।

আমি লিখতে পারিনি, কিন্তু বুঝিয়েছি।

আমি প্রকাশ করতে পারিনি, কিন্তু অনুভব করিয়েছি।

হাসপাতালের বেডে আমার শরীর পড়ে আছে। কিন্তু আমি এখন মুক্ত।

হ্যাপি আরাশকে বলছে, “তোমার বাবা কিছু বলতে পারত না। কিন্তু তার চোখে সব কিছু ছিল।”

আরাশ বলছে, “বাবা আমাকে কত ভালোবাসত। কখনো বলেনি, কিন্তু আমি জানতাম।”

সময়ের বাইরে থেকে দেখছি তারা আমার ভাষা বুঝেছিল। আমি ভেবেছিলাম কেউ বোঝে না।

আল্লাহ, তুমি আমাকে এই দৃষ্টি দিয়েছ যাতে আমি বুঝতে পারি যে আমার জীবনের কোনো মুহূর্তই বৃথা যায়নি।

আমার প্রতিটি নীরবতা কারো না কারো কাছে পৌঁছেছে।

আমার প্রতিটি অব্যক্ত ভালোবাসা কারো না কারো হৃদয়ে জায়গা করেছে।

কিন্তু এই উপলব্ধি এত দেরিতে কেন?

হয়তো জীবনের রহস্য এইখানেই। আমরা সময়ের ভেতরে থাকতে থাকতে কিছুই দেখতে পাই না।

শুধু সময়ের বাইরে এসে দেখি আসল ছবি।

আমি ফিরে যাব কি না জানি না। কিন্তু এই দর্শন আমার যথেষ্ট।

আমি জানতে পেরেছি যে আমার জীবনের একটা অর্থ ছিল।

আর সেই অর্থ ছিল ভালোবাসা। যেভাবেই হোক, যতটুকুই হোক।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *