রেস্তোরাঁ থেকে ফিরে এসেই মনে হল ঘরের খাবারে কী যেন অভাব। কাল দুপুরে হ্যাপি যে মাছের ঝোল করেছিল, আজ সকালে সেটা দেখে মনে হচ্ছে কেমন যেন সাদামাটা। গতকাল পর্যন্তও মনে হত এই ঝোলই পৃথিবীর সেরা খাবার।
কী এমন জাদু আছে বাইরের খাবারে যে একবার খেলেই ঘরের সব খাবার বিস্বাদ লাগতে শুরু করে? আজ দুপুরে সহকর্মীদের সাথে যেই রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলাম, সেখানকার বিরিয়ানিতে যে স্বাদ ছিল, এখন মনে হচ্ছে সেটাই আসল বিরিয়ানি। ঘরে হ্যাপি যেটা বানায়, সেটা বিরিয়ানিই নয়।
কিন্তু এই মনের অবস্থায় লজ্জা লাগে। হ্যাপি কত কষ্ট করে রান্na করে। ভোর থেকে উঠে বাজার করা, কাটাকুটি, রান্না – সব কিছু একা হাতেই। আর আমি? একবার বাইরে খেয়ে এসেই তার রান্নায় দোষ খুঁজছি।
সন্ধ্যায় খেতে বসে আমি কিছু বলিনি, কিন্তু মুখভাব লুকাতে পারিনি। হ্যাপি বুঝে গেছে। বলল, “কী হয়েছে? খাবার পছন্দ হচ্ছে না?” আমি বললাম, “না, না। খুব ভালো।” কিন্তু আমার কণ্ঠস্বরেই মিথ্যার চিহ্ন।
আরাশ খেতে খেতে বলল, “আব্বু, আজ দুপুরে আপনি কোথায় খেয়েছিলেন?” আমি বললাম রেস্তোরাঁর নাম। সে বলল, “সেখানকার খাবার কেমন?” আমি বলতে চাইলাম খুব ভালো, কিন্তু কথাটা গলায় আটকে গেল।
এই যে তুলনা, এই যে অসন্তুষ্টি – এটা কোথা থেকে আসে? ঘরের খাবার তো সেই একই উপকরণ দিয়ে তৈরি। একই চাল, একই মসলা। তাহলে বাইরে কেন ভালো লাগে?
হয়তো পরিবেশের কারণে। রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার যে অনুভূতি, ঘরে সেটা নেই। অথবা হয়তো এটাই মানুষের স্বভাব – যা পায় না, সেটাকেই ভালো মনে করা।
রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। বললাম, “তুমি রান্নায় কষ্ট করো, আমি সেটার মর্যাদা দিতে পারি না।” সে হেসে বলল, “আমি জানি তুমি মাঝে মাঝে এমন হও। কিছু মনে করি না।”
তার এই উদারতা দেখে আরো খারাপ লাগল। আমি এত স্বার্থপর কেন? এত অকৃতজ্ঞ কেন?
আল্লাহর কাছে মনে মনে বলি, “আমার মনের এই অবস্থা কি ঠিক? যে মানুষ আমার জন্য কষ্ট করে, তার কাজের সমালোচনা করি কেন?” মনে হয় যেন উত্তর আসছে – “কৃতজ্ঞতাই সুখের চাবিকাঠি।”
পরদিন সকালে হ্যাপি যে পরোটা বানাল, সেটা খেতে খেতে চেষ্টা করলাম গতকালের রেস্তোরাঁর স্বাদ ভুলে যেতে। চেষ্টা করলাম এই মুহূর্তের খাবারের স্বাদে মনোযোগ দিতে।
বুঝলাম যে তুলনা করাটাই ভুল। প্রতিটি খাবারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। ঘরের খাবারে যে ভালোবাসা আছে, রেস্তোরাঁয় সেটা নেই। রেস্তোরাঁর খাবারে যে আকর্ষণ আছে, ঘরে সেটা নেই।
কিন্তু জীবনে তো দুই-ই দরকার। মাঝে মাঝে বাইরের খাবার খাওয়া ভুল নয়। ভুল হল ঘরে ফিরে এসে ঘরের খাবারের সাথে তুলনা করা।
এই উপলব্ধিটুকুই অনেক। এই বোধটুকুই হয়তো আমাকে একটু ভালো মানুষ করে তুলবে।
একটু ভাবনা রেখে যান