ব্লগ

সুদমুক্ত ঋণের খোঁজে ইসলামিক ব্যাংকের দোরগোড়ায়

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ইসলামি ব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বোর্ডে লেখা “সুদমুক্ত ব্যাংকিং”। মনে আশা নিয়ে ভিতরে ঢুকি।

আরাশের স্কুল ফি বাকি। দুই মাস হয়ে গেছে। স্কুল থেকে নোটিস এসেছে। আর দেরি করলে তাকে বসিয়ে রাখবে। ৫০ হাজার টাকা লাগে। কোথায় পাব?

সাধারণ ব্যাংকে গেলে সুদ দিতে হবে। কোরআনে সুদ হারাম। তাই ইসলামিক ব্যাংকে এসেছি।

কাউন্টারে গিয়ে বলি, “আমার একটা লোন দরকার।”

অফিসার বলেন, “কী ধরনের লোন?”

আমি বলি, “ছেলের পড়াশোনার জন্য।”

তিনি একটা ফর্ম দেন। বলেন, “এটা পূরণ করুন।”

ফর্ম দেখে মাথা ঘুরে যায়। কত কাগজপত্র লাগে! বেতনের সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, গ্যারান্টি, জামিন।

“কোনো গ্যারান্টি লাগবে?” আমি জিজ্ঞেস করি।

“হ্যাঁ। দুইজন গ্যারান্টির দরকার।”

আমার কোনো গ্যারান্টি নেই। কে দেবে আমার গ্যারান্টি?

“সুদ কত?” আমি জিজ্ঞেস করি।

অফিসার বলেন, “আমরা সুদ দেই না। আমরা প্রফিট দেই।”

“প্রফিট মানে?”

“বছরে ১৮%।”

আমি চুপ থাকি। প্রফিট আর সুদের মধ্যে পার্থক্য কী? সংখ্যাটা তো একই।

“এটা কি সুদ নয়?” আমি জিজ্ঞেস করি।

অফিসার বলেন, “না না। এটা ইসলামিক শরিয়াহ অনুমোদিত।”

আমি বুঝি না। ১৮% সুদ আর ১৮% প্রফিট – দুটো কি আলাদা?

বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বলি। হ্যাপি বলে, “তাহলে নাও।”

আমি বলি, “কিন্তু এটা কি সুদ নয়?”

হ্যাপি বলে, “ইসলামিক ব্যাংক যদি বলে হালাল, তাহলে হালাল।”

কিন্তু আমার মনে সন্দেহ থেকে যায়।

পরদিন মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে যাই। তাকে বিষয়টা বলি।

ইমাম সাহেব বলেন, “ইসলামিক ব্যাংকের লোন হালাল। তবে নিয়ত ঠিক রাখতে হবে।”

“নিয়ত মানে?”

“যদি বাধ্য হয়ে নাও আর তাড়াতাড়ি শোধ করার চেষ্টা করো, তাহলে গুনাহ হবে না।”

আমি আরো কনফিউজড হয়ে যাই। হালাল নাকি হারাম?

বন্ধু জামিউরকে বলি। জামিউর বলে, “ভাই, এইসব নিয়ে এত ভাবিস কেন? দরকার হলে নে।”

কিন্তু আমি ভাবি। কারণ আমি জানি, আল্লাহর অবাধ্যতা করে পাওয়া টাকা কোনো কাজে আসে না।

ইন্টারনেটে সার্চ করি। দেখি অনেক মতবিরোধ। কেউ বলে হালাল, কেউ বলে হারাম।

এক ওয়েবসাইটে পড়ি, “ইসলামিক ব্যাংকের নামে সুদি কারবার চলে।”

আরেক সাইটে পড়ি, “ইসলামিক ব্যাংকিং সম্পূর্ণ হালাল।”

কার কথা বিশ্বাস করব?

আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যদি এটা সত্যিই হালাল হয়, তাহলে সাধারণ ব্যাংকের সাথে পার্থক্য কী? দুই জায়গাতেই তো একই হারে টাকা ফেরত দিতে হয়।

ইসলামিক ব্যাংক বলে, “আমরা ব্যবসার অংশীদার হই।” কিন্তু কোন্‌ ব্যবসা? আমি তো শিক্ষা ঋণ নিচ্ছি।

আমি যে টাকা নিব, সেটা দিয়ে আরাশের স্কুল ফি দেব। এখানে কোন্‌ ব্যবসা? কোন্‌ লাভ?

তবুও ব্যাংক বলে, “আমরা আপনার অংশীদার।” কিসের অংশীদার?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মাথা ব্যথা হয়ে যায়।

আরাশের স্কুল আবার ফোন করেছে। বলেছে, “আর দেরি করা যাবে না।”

কী করব? সুদি ব্যাংক থেকে নিব? নাকি ইসলামিক ব্যাংক থেকে?

দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী, সেটাই বুঝতে পারছি না।

হ্যাপি বলে, “যা দরকার, তাই করো। আল্লাহ বুঝবেন।”

কিন্তু আমি বুঝি না। আল্লাহ কী বুঝবেন? আমি যদি ভুল করি?

মনে পড়ে, রাসুল (সা.) বলেছেন, “হালাল স্পষ্ট, হারাম স্পষ্ট। এর মধ্যে সন্দেহজনক বিষয় আছে।” তিনি আরো বলেছেন, “সন্দেহজনক বিষয় পরিহার করো।”

তাহলে কি আমার এই লোন না নেওয়াই উচিত?

কিন্তু তাহলে আরাশের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে।

এই দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেছি। ইসলাম মানতে চাই। কিন্তু বাস্তবতাও মানতে হয়।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি, “হে আল্লাহ, আমাকে পথ দেখান। কোনটা হালাল, কোনটা হারাম – পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিন।”

কিন্তু উত্তর পাচ্ছি না।

হয়তো এটাই আমার পরীক্ষা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *