ব্লগ

বারান্দার দর্শন

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ আবার বারান্দায় বসেছে। হাতে কোনো বই নেই, কোনো খেলনা নেই। শুধু রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি জিজ্ঞেস করি, “কী দেখছিস?”

“মানুষ।”

“মানুষ দেখে কী হয়?”

আরাশ আমার দিকে তাকায়। তার চোখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য।

“বাবা, ওই যে রিকশাওয়ালা আঙ্কেল যান, উনি কি খুশি?”

আমি রিকশাওয়ালার দিকে তাকাই। ক্লান্ত মুখ, ঘামে ভেজা শার্ট।

“মনে হয় না।”

“কেন? উনি তো কাজ করছেন।”

আমি বুঝতে পারি না কী বলব। একটা এগারো বছরের বাচ্চা কেন এসব জটিল প্রশ্ন করে?

“আরাশ, তুই কেন এইসব ভাবিস?”

“আমি দেখি প্রত্যেকে কোথাও যাচ্ছে। কিন্তু কেউ খুশি দেখায় না।”

আমার বুকে ধক করে ওঠে।

আরাশ ঠিক বলেছে। আমিও তো প্রতিদিন বের হই। কাজের জন্য, টাকার জন্য। কিন্তু খুশি তো নই।

“বাবা, তুমিও কি খুশি নও?”

আমি থমকে যাই। আমার এগারো বছরের ছেলে আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন করেছে।

“কেন মনে হয় আমি খুশি নই?”

“তুমি সবসময় চিন্তায় থাক। হাসো না।”

আমি বুঝতে পারি, আরাশ আমাকে পর্যবেক্ষণ করে। আমার মুখের প্রতিটি ভাব সে খেয়াল করে।

“আরাশ, বড়দের অনেক দায়িত্ব থাকে।”

“দায়িত্ব মানে কি খুশি থাকা যায় না?”

আমি উত্তর দিতে পারি না। কারণ আমি নিজেই জানি না।

আরাশ আবার রাস্তার দিকে তাকায়।

“বাবা, ওই যে ছোট মেয়েটা স্কুল থেকে ফিরছে, ও কিন্তু হাসছে।”

আমি দেখি। সত্যিই, একটা ছোট মেয়ে তার মায়ের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। তার মুখে হাসি।

“তাহলে শিশুরা খুশি, বড়রা খুশি নয়?”

“কেন এমন হয় বাবা?”

আমি ভাবি, আরাশ আমার চেয়ে গভীর দর্শন করছে। সে বুঝতে চাইছে জীবনের অর্থ।

“আরাশ, হয়তো বড় হতে হতে আমরা ভুলে যাই কীভাবে খুশি হতে হয়।”

“তুমিও ভুলে গেছ?”

“হয়তো।”

আরাশ আমার হাত ধরে।

“বাবা, তুমি আমার সাথে বসে মানুষ দেখ। হয়তো তুমিও মনে করতে পারবে।”

আমি আরাশের পাশে বসি। আমরা দুজনে মিলে রাস্তার মানুষ দেখি।

আমি বুঝতে পারি, আরাশের এই অভ্যাস নিছক সময় কাটানো নয়। সে জীবন পড়ার চেষ্টা করছে।

হয়তো আমারও এভাবে বসে থাকা উচিত। হয়তো আমিও খুশি হওয়ার রহস্য খুঁজে পাব।

আরাশ আমাকে শেখাচ্ছে কীভাবে বাঁচতে হয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *