সন্ধ্যা ৭টা বেজে গেছে। অফিসের বাতিগুলো একটা একটা করে নিভে যাচ্ছে। অন্যান্য কলিগরা চলে গেছে। শুধু আমি বসে আছি কম্পিউটারের সামনে, একটা রিপোর্ট নিয়ে। হঠাত হ্যাপির ফোন। “কোথায়? কবে আসবে?” তখনই মনে পড়ে – আমার তো বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল।
এই ব্যাপারটা কী অদ্ভুত! বাড়ি ফেরা – এমন একটা মৌলিক কাজ যেটা প্রতিদিন করি, সেটা কীভাবে ভুলে যাই? যেন আমার মস্তিষ্ক থেকে ‘বাড়ি’ নামক ধারণাটাই মুছে গেছে।
কাজের চাপে পড়লে আমার সময়ের হিসাব থাকে না। মনে হয় এই কাজটা শেষ করেই ছাড়ব। কিন্তু এক কাজ শেষ হলে আরেকটা কাজ এসে যায়। এভাবে একটার পর একটা করতে করতে ভুলেই যাই যে একটা পরিবার আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
আরাশ একদিন বলেছিল, “আব্বু, আপনি কি অফিসেই থাকেন?” তার এই প্রশ্নে আমার মন খারাপ হয়েছিল। আমি কি সত্যিই পরিবারের চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি?
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস – পরিবার – এর কথা ভুলে যাই?”
এই ভুলে যাওয়ার পেছনে হয়তো একধরনের পালিয়ে বেড়ানোর মানসিকতা আছে। অফিসে আমার একটা নিয়ন্ত্রণ আছে। কাজ করলে ফলাফল পাই। কিন্তু বাড়িতে অনেক সমস্যা যেগুলোর সহজ সমাধান নেই।
কখনো কখনো মনে হয় অফিসই আমার নিরাপদ জগৎ। এখানে শুধু কাজ করলেই হয়। পারিবারিক দায়িত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সংসারের খরচ – এসব চিন্তা করতে হয় না।
হ্যাপি বলে, “তুমি কাজের নেশায় পরিবারকে ভুলে যাচ্ছ।” কিন্তু এটা নেশা নাকি বাধ্যবাধকতা?
রাত ৮টায় বাড়ি ফিরে আরাশকে দেখি পড়ার টেবিলে বসে আছে। সে আমার দিকে তাকায় কিন্তু কিছু বলে না। তার চোখে একটা অভিযোগ। যেন বলতে চাইছে – “আমার হোমওয়ার্কে সাহায্য করার কথা ছিল।”
খাবার টেবিলে বসি। হ্যাপি গরম করে খাবার দিয়ে দেয়। কিছু বলে না। কিন্তু তার নীরবতায় অনেক কথা।
এই বাড়ি ফেরার কথা ভুলে যাওয়া শুধু সময়ের বিষয় নয়। এটা অগ্রাধিকারের বিষয়। আমি অজান্তেই কাজকে পরিবারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
পরের দিন ঠিক করি, ঘড়িতে অ্যালার্ম দেব। ৬টায় বাজলেই অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যাব। কিন্তু অ্যালার্ম বাজার পর মনে হয় – “আরো দশ মিনিট। এই কাজটা শেষ করেই যাই।”
এই “আরো দশ মিনিট” হয়ে যায় এক ঘণ্টা। আবার হ্যাপির ফোন। আবার সেই একই লজ্জা।
হয়তো আমার জেনারেশনের সমস্যা এটাই। আমরা কাজকে জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ মনে করি। কিন্তু ভুলে যাই যে কাজ করি পরিবারের জন্যই।
এখন চেষ্টা করি ৬টার পর কোনো নতুন কাজ হাতে না নিতে। যা আছে তা পরের দিন করব। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মানা কঠিন যখন বস বলে “এটা আজকেই শেষ করতে হবে।”
একটু ভাবনা রেখে যান