ব্লগ

ওই মোবাইলে আমার ব্যর্থতার প্রতিফলন

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশের ক্লাসমেট রিহান তার নতুন মোবাইল দেখাচ্ছে। গেমস আছে, ক্যামেরা আছে, ইন্টারনেট আছে।

আরাশ মুগ্ধ চোখে দেখছে।

“বাবা এইটা কিনে দিয়েছে। বলেছে ভালো নম্বর পেলে আরো ভালো ফোন কিনে দেবে।”

আরাশ আমার দিকে তাকায়। তার চোখে একটা নিরব প্রশ্ন।

আমি জানি সে কী জানতে চায়। কিন্তু আমি জানি আমার উত্তর কী হবে।

বাড়িতে এসে আরাশ বলে, “বাবা, রিহানের নতুন মোবাইল দেখেছ?”

“দেখেছি।”

“খুব সুন্দর না?”

“হ্যাঁ।”

আরাশ চুপ হয়ে যায়। কিন্তু আমি জানি তার মনের কথা।

“বাবা, আমারও কি একটা মোবাইল হবে?”

আমার বুকের ভিতরটা চিরে যায়।

“তোর বয়স এখনো হয়নি।”

“রিহানের বয়স তো আমার সমান।”

আমি আর কিছু বলতে পারি না।

সত্য হচ্ছে, আরাশের একটা মোবাইল থাকা দরকার। স্কুলে সবার আছে। সে একা পিছিয়ে থাকছে। কিন্তু আমার কাছে পনেরো হাজার টাকা নেই।

আমি হিসাব কষি। এই মাসে বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বাজারের খরচ—সব মিলিয়ে হাতে থাকে খুব কম। মোবাইল কেনার মতো অতিরিক্ত টাকা কোথায়?

কিন্তু আরাশ তো এই হিসাব বোঝে না। সে শুধু দেখে অন্য বাচ্চাদের কাছে যা আছে, তার কাছে নেই।

রাতে আমি হ্যাপিকে বলি, “আরাশ মোবাইল চাইছে।”

“কত দাম?”

“কমপক্ষে পনেরো হাজার।”

হ্যাপি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। “এখন কোথায় পাব?”

“জানি না।”

আমরা দুজনেই চুপ হয়ে যাই।

পরদিন আমি দেখি আরাশ স্কুল থেকে ফিরে এসে একা একা বসে আছে। সে বন্ধুদের সাথে কথা বলতে পারছে না। কারণ তারা সবাই মোবাইল নিয়ে আলাপ করে।

আরাশ আইসোলেটেড হয়ে যাচ্ছে।

আমি ভাবি, আমি কি আরাশের শৈশব নষ্ট করছি? অন্য বাচ্চারা যে জিনিসগুলো নিয়ে আনন্দ করে, সে সেগুলো থেকে বঞ্চিত।

আমি আমার পুরনো ল্যাপটপ বিক্রি করার কথা ভাবি। কিন্তু সেটা দিয়ে আমি লেখালেখি করি। সেটা বিক্রি করে দিলে আমার কাজই বন্ধ হয়ে যাবে।

আমি আমার বইগুলো বিক্রি করার কথা ভাবি। কিন্তু সেগুলো আমার জীবনের অংশ।

শেষপর্যন্ত আমি আমার মায়ের দেওয়া সোনার আংটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিই।

সেই টাকায় আরাশের জন্য একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড মোবাইল কিনি।

আরাশ খুশি হয়। কিন্তু আমার বুকে একটা খালি জায়গা তৈরি হয়।

আমি ভাবি—একজন বাবার জন্য কি এটাই স্বাভাবিক? নিজের সবকিছু বিক্রি করে সন্তানের চাহিদা মেটানো?

নাকি এটা আমার অক্ষমতার প্রমাণ?

আল্লাহ, আমি কবে আরাশকে স্বাচ্ছন্দ্যে সব দিতে পারব?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *