জীবন

টিকটিক

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকালে চোখ খুলেই একটা কথা মনে পড়ল।

“গতকাল সুলতানকে যা বলেছিলাম, সেটা ঠিক হয়নি।”

কী বলেছিলাম? মনে নেই ঠিক। কিন্তু ভুল হয়েছে, এটা জানি।

বিছানা থেকে উঠলাম। বাথরুমে গেলাম। আয়নায় তাকালাম।

মনে পড়ল স্কুলের কথা। ক্লাস সেভেন। টিচার বকা দিয়েছিল। সবার সামনে। লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে ছিলাম।

কত বছর হয়ে গেছে? বিশ? পঁচিশ?

কিন্তু এখনো মনে আছে।

নাশতা করতে বসলাম। হ্যাপি চা দিল।

“কী ভাবছ?” সে জিজ্ঞেস করল।

“কিছু না।”

“মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে না।”

মিথ্যা বলা যায় না হ্যাপিকে।

“ভাবছিলাম অফিসের কথা।”

“কী হয়েছে?”

“বস গতকাল একটা প্রজেক্ট দিয়েছে। বড় প্রজেক্ট।”

“পারবে না?”

“জানি না।”

হ্যাপি চুপ করে রইল। চা খেল।

“তুমি জানো,” সে বলল, “তুমি সব সময় এমন করো।”

“কী করি?”

“চিন্তা করো। এখনো কিছু হয়নি, কিন্তু তুমি ভাবছ যদি হয় তাহলে কী হবে।”

ঠিক কথা। এখনো কিছু হয়নি।

আরাশ এসে বসল। “আব্বু, আজ তুমি আমাকে স্কুল দিয়ে যাবে?”

“না, আজ পারব না।”

“কেন?”

“অফিসে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।”

“আচ্ছা।”

আরাশ চুপ করে খেতে লাগল। আমি তাকালাম। মুখ মলিন।

“কী হয়েছে?”

“কিছু না।”

“বলো তো।”

“তুমি কখনো সময় পাও না।”

কথাটা শুনে বুকে লাগল। কিন্তু কী বলব?

“আব্বু ব্যস্ত আরাশ।”

আরাশ কিছু বলল না। উঠে গেল।

হ্যাপি বলল, “তুমি সত্যিই ব্যস্ত। কিন্তু মন তো আরো ব্যস্ত।”

“মানে?”

“মানে তুমি এখানে বসে আছ। কিন্তু তোমার মন অফিসে।”

চুপ করে রইলাম। ঠিক কথা।

অফিসে যেতে যেতে ভাবছি কলেজের কথা। সেই মেয়েটার কথা। নাম কী ছিল? রিনা? রিমা?

প্রেম করতাম। কিন্তু বলিনি। সাহস হয়নি।

এখন কোথায় আছে? বিয়ে হয়েছে? বাচ্চা হয়েছে?

জানি না। কিন্তু ভাবি।

ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেছি। সামনে দেখলাম একটা দুর্ঘটনা হয়েছে। গাড়ি উল্টে গেছে।

মনে পড়ল বাবার কথা। বাবা মারা গেছে গাড়ি দুর্ঘটনায়।

চোখ বন্ধ করলাম। আবার খুললাম।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

অফিসে পৌঁছে সহকর্মী বলল, “গুড মর্নিং।”

“মর্নিং।”

“কেমন আছেন?”

“ভালো।”

মিথ্যা। ভালো নেই।

টেবিলে বসলাম। কম্পিউটার খুললাম। ইমেইল দেখছি।

কিন্তু মন নেই। মন ভাবছে বিকেলের কথা। মায়ের সাথে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

মায়ের বয়স হয়েছে। অসুখ লেগেই আছে।

আর কতদিন?

এই চিন্তা এলেই বুক কাঁপে।

দুপুরে খাবার খেতে গেলাম। খেতে খেতে ভাবছি বিকেলের মিটিং নিয়ে। বস থাকবে। সব ঠিক রাখতে হবে।

সুলতান এসে বসল পাশে।

“কী খবর?”

“ভালো।”

“তুই ঠিক আছিস?”

“হ্যাঁ। কেন?”

“মুখ দেখে মনে হচ্ছে না।”

সবাই বলছে আজ। মুখ খারাপ দেখাচ্ছে।

“একটু টেনশন।”

“কিসের?”

কী বলব? অতীত? ভবিষ্যত? যা হয়নি তার ভয়? যা হয়ে গেছে তার জ্বালা?

“কাজের টেনশন।”

সুলতান চুপ করে খেল। তারপর বলল, “তুই জানিস, তোর একটা সমস্যা আছে।”

“কী সমস্যা?”

“তুই কখনো এখানে থাকিস না।”

“মানে?”

“মানে তোর শরীর এক জায়গায়, মন আরেক জায়গায়।”

কথা শেষ করে সুলতান চলে গেল। আমি বসে রইলাম।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম। ক্লান্ত।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?”

“হ্যাঁ।”

“কী বলল?”

“বলল ঠিক আছে। ওষুধ দিয়েছে।”

“আর?”

“আর কিছু না।”

কিন্তু মন ভালো নেই। ডাক্তারের চেম্বারে বসে ছিলাম। কিন্তু মাথায় ছিল অফিসের মিটিং। কী হলো? ঠিক হলো তো?

ফোন দেখলাম। কোনো মেসেজ নেই। মানে ভালো হয়েছে। নাকি খারাপ?

জানি না।

খাবার খেতে বসলাম। আরাশ চুপচাপ খাচ্ছে।

“আজ স্কুলে কেমন ছিল?”

“ভালো।”

“কী করেছিস?”

“ছবি এঁকেছি।”

“কী এঁকেছিস?”

“বৃষ্টি।”

বৃষ্টি। মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। বৃষ্টিতে ভিজতাম। খেলতাম। দৌড়াতাম।

কোনো চিন্তা ছিল না। শুধু বৃষ্টি। শুধু খেলা।

কখন হারিয়ে গেল সেই সময়?

রাতে ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসছে না।

উঠে জানালায় দাঁড়ালাম। রাস্তা ফাঁকা।

হ্যাপি এসে পাশে দাঁড়াল। “ঘুম আসছে না?”

“না।”

“কী ভাবছ?”

“কিছু না।”

“সত্যি বলো।”

“ভাবছি… জানি না। অনেক কিছু।”

“অতীতের কথা? ভবিষ্যতের কথা?”

তাকিয়ে রইলাম। হ্যাপি সব জানে।

“দুটোই।”

“এখনের কথা কখনো ভাবো?”

“এখনের কী আছে?”

হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি আছি। আরাশ আছে। তুমি আছ। এটাই তো এখন।”

ভাবলাম। ঠিক কথা।

পরদিন সকালে ঠিক করলাম। আজ একটু বদলাব।

চা বানাতে গেলাম। সাধারণত চা বানাতে বানাতে ভাবি অন্য কিছু। আজ চেষ্টা করলাম শুধু চা বানাতে মন দিতে।

পানি ফুটছে। শব্দ হচ্ছে। গুড়গুড়।

চায়ের পাতা দিলাম। গন্ধ এল। ভালো গন্ধ।

কাপে ঢাললাম। বাষ্প উঠছে।

আরাশ এল। “আব্বু, কী করছ?”

“চা বানাচ্ছি।”

“আমি দেখতে পারি?”

“হ্যাঁ।”

আরাশ দাঁড়িয়ে দেখল। “আব্বু, তুমি আজ অন্যরকম।”

“কীরকম?”

“জানি না। তোমার মুখ ভালো লাগছে।”

হাসলাম। “তাই?”

“হ্যাঁ।”

চা খেলাম। ধীরে ধীরে। আরাশের সাথে কথা বললাম। ফোন দেখলাম না।

হ্যাপি বলল, “আজ তুমি তাড়া করছ না।”

“না।”

“ভালো লাগছে।”

ভালো লাগছে। আমারও।

সন্ধ্যায় পার্কে গেলাম। একা। কোনো ফোন নেই। কোনো হেডফোন নেই।

শুধু হাঁটছি। পা ফেলছি। অনুভব করছি।

একটা বেঞ্চে একজন বুড়ো মানুষ বসে আছেন। চোখ বন্ধ। কিন্তু ঘুমাচ্ছেন না।

আমি পাশে বসলাম।

কিছু বললাম না। সে কিছু বলল না।

বসে রইলাম। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট।

চারদিকে তাকালাম। গাছ আছে। পাখি আছে। হাওয়া বইছে।

এখানে আমার কোনো সমস্যা নেই।

অতীত নেই। ভবিষ্যত নেই।

শুধু এই বেঞ্চ। এই বুড়ো মানুষ। এই হাওয়া।

বুড়ো মানুষ উঠে গেলেন। আমি বসে রইলাম।

কতক্ষণ বসে ছিলাম? জানি না। ঘড়ি দেখিনি।

বাসায় ফিরে আরাশ বলল, “আব্বু, তুমি কোথায় ছিলে?”

“পার্কে।”

“একা?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“এমনি।”

আরাশ আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “আব্বু, তুমি কি সুখী?”

কী উত্তর দেব?

“জানি না আরাশ।”

“তাহলে কীভাবে বুঝবে?”

কীভাবে? কীভাবে বুঝব?

“বলো তুমি।”

আরাশ ভাবল। তারপর বলল, “আমি যখন খেলি, তখন আমি খুশি। কারণ আমি শুধু খেলি। আর কিছু ভাবি না।”

শুধু খেলে। আর কিছু ভাবে না।

“তুমি ঠিক বলেছ।”

রাতে ঘুমাতে গেলাম। শুয়ে রইলাম।

মন আবার যেতে চাইছে। কাল অফিসে কী হবে? গতকাল কী ভুল করেছি?

কিন্তু আমি ফিরিয়ে আনছি। এখানে।

শ্বাস নিচ্ছি। ছাড়ছি।

হাত বুকে রেখেছি। ওঠানামা করছে।

পাশের রুম থেকে ঘড়ির শব্দ আসছে। টিকটিক। টিকটিক।

আগে কখনো শুনিনি। আজ শুনছি।

প্রতিটা টিক একটা মুহূর্ত।

আমি কোনটায় আছি?

এইটায়। না, এইটায়। না, এইটায়।

হয়তো কোনোটায় নেই। হয়তো সব মুহূর্তে আছি। হয়তো একটাতেও নেই।

জানি না।

চোখ বন্ধ করলাম। টিকটিক শুনছি।

কাল আবার একই হবে। অতীত আসবে। ভবিষ্যত আসবে।

কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে, শুধু এই শব্দ।

টিকটিক। টিকটিক।

হয়তো এটাই যথেষ্ট। হয়তো না।

জানি না।

ঘুম এল। চোখ বন্ধ হয়ে গেল।

টিকটিক। টিকটিক।

আত্মউপলব্ধি জীবনবোধ জীবনযাপন জীবনের-পাঠ মননশীলতা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *