আজ সকালে হ্যাপি ফেসবুকে আমাদের বিয়ের পনেরো বছর পূর্তির একটা পোস্ট দিয়েছে। একটা সুন্দর ছবি – আমরা দুজন হাসছি, পেছনে আরাশ। ক্যাপশনে লিখেছে “১৫ বছরের সুখের যাত্রা।” তিনশো লাইক, পঞ্চাশটা কমেন্ট।
কিন্তু সত্যি তো হলো, গতকাল রাতে আমরা তিনদিনের নতুন চাকরি হারানো নিয়ে ঝগড়া করেছিলাম। হ্যাপি কেঁদেছে। আমি রাগে দরজা ধাম করে বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম। আরাশ আমাদের দেখে নিজের ঘরে চলে গেছে।
তাহলে এই পোস্টটা কি মিথ্যা? নাকি আমরা নিজেদের বিক্রি করছি?
অফিসে এক সহকর্মী আমাকে তার ইনস্টাগ্রাম দেখাল। সেখানে সে একজন সফল উদ্যোক্তা। ব্র্যান্ডেড কাপড়, দামি রেস্তোরাঁ, মোটিভেশনাল কোট। আমি জানি তার বেতন আমার চেয়ে কম। তার বাড়িভাড়া দিতে কষ্ট হয়। তবু সে এক ধরনের সত্য বলছে – তার স্বপ্নের সত্য।
ফিরে এসে আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই সোশ্যাল মিডিয়া দেখিস?”
“হ্যাঁ বাবা। আমার ইউটিউব চ্যানেল আছে।”
“কী ধরনের?”
“আমি রাস্তার মানুষদের স্কেচ করি। তারপর আপলোড দিই। এখন পর্যন্ত বিশজন সাবস্ক্রাইবার।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। “কেন করিস এটা?”
“বাবা, আমি যখন মানুষ দেখি, তাদের মুখে এমন কিছু থাকে যেটা ক্যামেরা ধরতে পারে না। স্কেচ করলে সেটা আসে। আর যখন আপলোড দিই, অন্য দেশের মানুষ কমেন্ট করে। একজন জাপানি বলেছে, ‘Your drawing shows the soul.’ মানে আমি আত্মা দেখাতে পারি!”
আমার ভিতরের একটা অ্যাপ আপডেট হয়ে গেল। নাম বদলে গেল ‘গর্ব’ থেকে ‘রহস্য’।
রাতে হ্যাপির পাশে শুয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই আজ যে পোস্ট দিয়েছিলি, সেটা কি সত্যি ছিল?”
“কেন, মিথ্যা নাকি?”
“না, মানে… আমরা তো গতকাল…”
“হায়দার, আমি কি সুখী না?”
প্রশ্নটা আমাকে থামিয়ে দিল। হ্যাপি সত্যিই সুখী। আমি চাকরি হারালেও সে আমাকে ছাড়েনি। আমার সব পাগলামি নিয়েও তার মুখে সেই হাসি। গতকালের ঝগড়া আমাদের পনেরো বছরের ভালোবাসা কি মুছে দিতে পারে?
“তুই সত্যি বলেছিস,” আমি বললাম।
“তাহলে?”
তাহলে কী? আমি ভাবছিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা নিজেদের বিক্রি করি। কিন্তু হয়তো আমরা নিজেদের সেই অংশটুকু দেখাই যেটুকু আমরা সত্যিই হতে চাই। হ্যাপির পোস্ট তার স্বপ্ন। সহকর্মীর ইনস্টাগ্রাম তার আকাঙ্ক্ষা। আরাশের স্কেচ তার দর্শন।
আর আমি? আমি কি কিছু পোস্ট করি? না। কেন? কারণ আমি জানি না আমি কী হতে চাই। আমার স্বপ্নটা কী? আমার আকাঙ্ক্ষা কোনটা?
বাজারে যারা জিনিস বিক্রি করে, তারা জানে তাদের কাছে কী আছে। আমি জানি না আমার কাছে কী আছে। তাই বিক্রি করব কী?
হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা নিজেদের বিক্রি করি না, বরং নিজেদের খুঁজি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেমন নিজেকে দেখি, সোশ্যাল মিডিয়ায় দাঁড়িয়েও তেমনি। কিন্তু এই আয়নায় শুধু আমার মুখ নয়, আমার আত্মাও প্রতিফলিত হয়।
হ্যাপির আত্মা বলে – আমি ভালোবাসি। আমার সহকর্মীর আত্মা বলে – আমি স্বপ্ন দেখি। আরাশের আত্মা বলে – আমি মানুষকে বুঝতে চাই।
আর আমার আত্মা? আমার আত্মা এখনও নীরব। কারণ আমি এখনও নিজের কাছেই পরিচিত নই।
বিক্রি করতে হলে আগে জানতে হয় কী আছে। আমি এখনও জানি না।
একটু ভাবনা রেখে যান