সকাল সাতটায় অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হই।
হ্যাপি বলে, “নাস্তা?”
“পরে খাব।”
“তুমি সবসময় পরে বলো।”
কিছু বলি না। জুতো পরি। দরজা খুলি।
আরাশ দৌড়ে আসে। “বাবা, টাটা!”
মাথায় চুমু দিই। “টাটা।”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবি, এইমাত্র যে মানুষটা ছিল—সে কে?
অফিসে ঢুকে সবাইকে মাথা নাড়ি। সাইফুল বলে, “মিটিং দশটায়।”
“জানি।”
ডেস্কে বসি। কম্পিউটার অন করি। মেইল চেক করি।
বস ঢোকে। সবাই উঠে দাঁড়ায়। আমিও উঠি।
“বসো বসো।”
বসি।
মিটিংয়ে কথা বলি। গলার স্বর সমান। মুখে হাসি নেই। কথাগুলো ছোট, পরিষ্কার।
সাইফুল পাশ থেকে ফিসফিস করে, “তুই এত সিরিয়াস কেন?”
কিছু বলি না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি।
আরাশ দরজায় দাঁড়িয়ে।
“বাবা! ক্রিকেট খেলবে?”
“চল।”
ছাদে যাই। সে বল করে, আমি ব্যাট করি।
“আউট!”
“আউট না। লেগ বাই।”
“না! আউট!”
আমি হাসি। সে হাসে।
এই হাসিটা কোথা থেকে এলো? সকালে তো ছিল না। অফিসেও ছিল না।
আরাশ বলে, “বাবা, তুমি হাসছ!”
“হাসছি তো।”
“অফিস থেকে আসার পর তুমি অন্য বাবা হয়ে যাও।”
থমকে যাই।
“মানে?”
“মানে… ভালো বাবা।”
বলটা হাতে নিই। ঘোরাই। কিছু বলি না।
রাতে খাওয়ার পর হ্যাপির পাশে বসি। সে টিভি দেখছে।
“আজকে অফিস কেমন ছিল?”
“ঠিকঠাক।”
সে আমার দিকে তাকায়।
“তুমি আমার সাথে অন্যরকম থাক।”
“কীরকম?”
“জানি না। নরম।”
চুপ করে থাকি।
“এটা ভালো না খারাপ?”
“আলাদা।”
টিভিতে একটা নাটক চলছে। কেউ কাঁদছে। আমি দেখছি কিন্তু বুঝছি না।
শনিবার সাইফুলের সাথে চা খেতে যাই।
সে বলে, “তোর কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“তুই অফিসে একরকম। আমার সাথে আরেকরকম।”
“তুইও তো।”
“আমি?”
“হ্যাঁ। তোর বউয়ের সামনে তুই অন্য মানুষ।”
সে হাসে।
“সেটা তো সবাই।”
“সবাই?”
“হ্যাঁ। তুই কি মনে করিস সবাই সব জায়গায় একরকম থাকে?”
চায়ে চুমুক দিই। লাল চা। চিনি কম।
“তাহলে আসল কোনটা?”
“আসল?”
“হ্যাঁ। কোন আমি আসল?”
সে একটু ভাবে।
“হয়তো সবগুলোই।”
“সবগুলো একসাথে আসল হয় কীভাবে?”
“জানি না।”
সেই রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি বসে থাকি।
বারান্দায়। একা।
রাত গভীর। রাস্তায় কেউ নেই। দূরে একটা বিড়াল ডাকছে।
ভাবি, দিনে আমি কতজন ছিলাম?
সকালে যে লোক দরজা দিয়ে বের হলো—সে গম্ভীর ছিল, তাড়াহুড়ো ছিল।
অফিসে যে লোক মিটিংয়ে কথা বলল—সে ঠান্ডা ছিল, হিসাবি ছিল।
আরাশের সাথে যে লোক ক্রিকেট খেলল—সে হাসছিল, দৌড়াচ্ছিল।
হ্যাপির পাশে যে লোক বসেছিল—সে চুপচাপ ছিল, নরম ছিল।
আর এখন?
এখন কে বসে আছে?
পরদিন অফিসে বুলবুল ভাই বললেন, “তুমি তো খুব শান্ত মানুষ।”
“শান্ত?”
“হ্যাঁ। কখনো রাগ করতে দেখিনি।”
হাসলাম।
বাড়িতে গিয়ে হ্যাপিকে বললাম, “আমি নাকি শান্ত মানুষ।”
সে হাসল।
“কে বলল?”
“অফিসে।”
“তুমি? শান্ত?”
“কেন? আমি শান্ত না?”
“তুমি তো সারাক্ষণ কিছু না কিছু নিয়ে ভাবো।”
“ভাবলে শান্ত হওয়া যায় না?”
“তোমার ভাবনা তো শান্ত না।”
চুপ করে রইলাম।
আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি অফিসে কী করো?”
“কাজ করি।”
“কীরকম কাজ?”
“কম্পিউটারে।”
“মজার?”
“না।”
“তাহলে কেন করো?”
“টাকা লাগে।”
সে একটু ভাবল।
“তুমি অফিসে গেলে মজা পাও না?”
“না।”
“কিন্তু আমার সাথে খেললে মজা পাও?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে অফিসে যাও কেন? আমার সাথে থাকো।”
তার মাথায় হাত রাখলাম।
“এত সহজ না।”
“কেন?”
“বড় হলে বুঝবে।”
সে চলে গেল।
আমি ভাবলাম, অফিসের লোকটা আর এই লোকটা—এরা কি একই মানুষ?
বাবু ফোন করল।
“কী করছিস?”
“কিছু না।”
“চল আড্ডা দিই।”
পুরান ঢাকায় গেলাম। সেই চায়ের দোকান।
বাবু বলল, “তোকে দেখে মনে হয় তুই অনেক কিছু ভাবছিস।”
“ভাবছি।”
“কী?”
“আমি কে।”
সে হাসল।
“এত বড় প্রশ্ন?”
“তোর কি মনে হয় না তুই বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মানুষ?”
“মনে হয়।”
“তাহলে আসল কোনটা?”
“আসল বলে কিছু আছে?”
চুপ করে রইলাম।
“দেখ,” বাবু বলল, “আমি বাবার সামনে একরকম। বউয়ের সামনে আরেকরকম। তোর সামনে আরেকরকম। এতে সমস্যা কী?”
“সমস্যা হলো—আমি জানি না কোনটা আমি।”
“হয়তো সবগুলোই তুই।”
“সবগুলো একসাথে?”
“হ্যাঁ।”
চা এলো। গরম। ধোঁয়া উঠছে।
সেই রাতে বিছানায় শুয়ে হ্যাপিকে বললাম, “তুমি কি আমাকে চেনো?”
সে অন্ধকারে আমার দিকে ফিরল।
“কী বলছ?”
“মানে… তুমি কি জানো আমি কে?”
“তুমি আমার স্বামী।”
“সেটা তো সম্পর্ক। আমি জিজ্ঞেস করছি—আমি কে?”
সে চুপ করে রইল।
“তুমি অদ্ভুত প্রশ্ন করো।”
“করি।”
“ঘুমাও।”
সে পাশ ফিরল।
আমি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
শেভ করছি। ফোম লাগাচ্ছি। ব্লেড চালাচ্ছি।
আরাশ এলো।
“বাবা।”
“হুম।”
“তুমি এখন কোন বাবা?”
থামলাম।
“মানে?”
“মানে… অফিসের বাবা, না আমার বাবা?”
আয়নায় তাকালাম। ফোমওয়ালা মুখ। অর্ধেক শেভ করা।
“জানি না।”
সে চলে গেল।
আমি আয়নায় তাকিয়ে রইলাম।
লোকটা তাকিয়ে রইল।
বাইরে কাক ডাকছে। সকাল হচ্ছে। অফিস যেতে হবে।
ব্লেড তুললাম। আবার শুরু করলাম।
একটু ভাবনা রেখে যান