সকাল আটটায় অফিসে ঢুকেছিলাম। একটা সাধারণ কাজ – আরাশের জন্মসনদের একটা কপি সত্যায়ন করাবো। ভেবেছিলাম এক ঘন্টার কাজ। কিন্তু এখন দেয়ালের ঘড়িতে দেখছি সন্ধ্যা সাতটা। আর আমি এখনও এই অফিসের মধ্যেই আছি।
প্রথমে বলা হলো কাগজটা ভুল কাউন্টারে দিয়েছি। দ্বিতীয় কাউন্টারে গিয়ে বলা হলো কাগজে একটা তারিখের সমস্যা আছে। তৃতীয় কাউন্টারে বলা হলো আমার জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে কাগজের নামের বানান মিলছে না। চতুর্থ কাউন্টারে বলা হলো ফি দিতে হবে, কিন্তু ক্যাশ কাউন্টার বন্ধ।
আমি বুঝতে পারছি, এটা কোনো সাধারণ অফিস নয়। এটা একটা কালো গহ্বর। যেখানে সময় থেমে যায়। যেখানে মানুষ ঢুকে পড়ে, আর তারপর ঘুরপাক খেতে থাকে। একটা অদৃশ্য হাত আমাকে টেনে নিয়ে চলেছে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে।
পঞ্চম কাউন্টারের একজন ভদ্রলোক, চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “আপনার কাগজটা এই অফিসে হবে না। ওই অফিসে যান।” আমি জিজ্ঞেস করলাম কোন অফিস। তিনি হাত দিয়ে একটা অস্পষ্ট দিক নির্দেশ করলেন।
আমি সেই দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, যত হাঁটছি, ততই মনে হচ্ছে আমি আবার সেই একই জায়গায় ফিরে আসছি। করিডোরগুলো একই রকম দেখতে। দেয়ালের রঙ একই। এমনকি মানুষগুলোও একই রকম হতাশ মুখ।
মনে পড়ছে হ্যাপি সকালে বলেছিল, “তাড়াতাড়ি এসো। আরাশের স্কুলে যেতে হবে।” আমি বলেছিলাম, “এক ঘন্টার মধ্যে ফিরে আসব।” কিন্তু এখন আমি জানি না আমি কখনো ফিরতে পারব কিনা।
ষষ্ঠ কাউন্টারে একজন কেরানি আছেন যিনি দেখতে ঠিক প্রথম কাউন্টারের কেরানির মতো। একই মুখ, একই চশমা, একই ক্লান্তি। তিনি বললেন, “আপনার কাগজে একটা সীল নেই।” আমি দেখলাম সীল আছে। কিন্তু তিনি বললেন, “এটা পুরনো সীল। নতুন সীল লাগবে।”
আমি বুঝতে পারলাম, এই অফিসের নিজস্ব সময় আছে। নিজস্ব নিয়ম আছে। নিজস্ব যুক্তি আছে। আর সেই যুক্তি আমার মানুষিক যুক্তির সাথে মিলবে না।
সপ্তম কাউন্টারে পৌঁছে দেখি সেখানে আরও মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মুখে একই অভিব্যক্তি – হারিয়ে যাওয়া মানুষের চোখ। একজন বললেন, “আমি তিন দিন ধরে এখানে আছি।” আরেকজন বললেন, “আমি এক সপ্তাহ।” একজন বৃদ্ধা বললেন, “আমার মনে হয় আমি এক মাস ধরে এখানে আছি, কিন্তু নিশ্চিত নই।”
আমি ভাবছি, আমি কি আজীবনের জন্য এই অফিসের কয়েদি হয়ে গেলাম? আমি কি আর কখনো আরাশের স্কুল পৌঁছানোর গল্প শুনতে পারব না? হ্যাপির রান্না করা খাবার খেতে পারব না?
অষ্টম কাউন্টারে গিয়ে দেখি সেই একই ভদ্রলোক যিনি প্রথম কাউন্টারে ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, “আপনি আবার এসেছেন? আপনার কাগজ তো এখানে হবে না।” আমি বললাম, “কিন্তু আপনিই তো আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।” তিনি আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি কোনো ভূত।
আমি বুঝতে পারলাম, এই অফিসে প্রবেশ করা মানে একটা অদৃশ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করা। যেখানে লেখা আছে: “আপনি এখানে যা চান, তা পাবেন না। আপনি যা পাবেন, তা চান না।” আর সবচেয়ে বড় কথা: “আপনি যতক্ষণ না আমরা চাই, ততক্ষণ এখান থেকে বের হতে পারবেন না।”
নবম কাউন্টারে একটা আয়না আছে। আমি নিজেকে দেখলাম। আমার চেহারা বদলে গেছে। চোখে সেই একই হারিয়ে যাওয়া ভাব। আমিও এই অফিসের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছি।
আল্লাহ, আমি কি এমন কোনো পাপ করেছি যার শাস্তি এই? নাকি এটাই আমাদের জীবনের সত্য – একটা অসীম লুপ, যেখানে আমরা ঘুরপাক খেতে থাকি, আর ভাবি যে আমরা কোনো এক গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছি?
দশম কাউন্টারে পৌঁছে আমি দেখি সেখানে একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে: “বন্ধ”। কিন্তু একটা তীর চিহ্ন দেখাচ্ছে একাদশ কাউন্টারের দিকে।
আমি জানি না এই যাত্রার শেষ কোথায়। আমি জানি না আমি কবে বাড়ি ফিরব। আমি শুধু জানি, এই অফিসে ঢুকে আমি আর সেই হায়দার নেই যে সকালে এসেছিলাম। আমি এখন এই অফিসের একটা অংশ। এই দেয়ালের মতো স্থায়ী, এই টেবিলের মতো স্থির।
আর হয়তো এটাই আমাদের সবার পরিণতি – একদিন আমরা সবাই এমন কোনো অফিসে ঢুকব, যেখান থেকে আর বের হওয়া যায় না।
একটু ভাবনা রেখে যান