রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। ট্রাফিক দেখছি।
একটা গলা শুনলাম। “তুমি?”
ঘুরে তাকালাম। জিনিয়া।
দশ বছর পর।
“কেমন আছ?” সে জিজ্ঞেস করল।
“ভালো। তুমি?”
“ভালো।”
চুপ।
“যাই তাহলে,” সে বলল।
“হ্যাঁ।”
সে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
এই মেয়েটার জন্য একদিন পাগল ছিলাম।
বাসায় ফিরে পুরনো বাক্স খুললাম। ডায়েরি আছে। স্কুলের।
পাতা উল্টালাম। লেখা দেখলাম।
“তুমি আমার আকাশের চাঁদ। আমার স্বপ্নের পরী।”
হাসি পেল। কী বালকসুলভ!
কিন্তু মনে পড়ল সেই রাতের কথা। যখন লিখেছিলাম। হাত কাঁপছিল। বুক ধড়ফড় করছিল।
সেই মুহূর্তে সত্যি ছিল। প্রতিটা শব্দ।
এখন? হাস্যকর লাগে।
হ্যাপি এসে বলল, “কী দেখছ?”
“পুরনো ডায়েরি।”
“কার?”
“আমার। স্কুলের।”
হ্যাপি পাশে বসল। পড়ল। হাসল।
“কে ছিল এই মেয়ে?”
“জিনিয়া। প্রথম প্রেম।”
“এখন কোথায়?”
“জানি না। আজ দেখা হয়েছিল রাস্তায়।”
“কেমন লাগল?”
কেমন লাগল? জানি না।
“অন্যরকম।”
“মানে?”
“মানে আগে মনে হতো পরী। আজ দেখলাম সাধারণ মানুষ।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি পাল্টে গেছ। তাই ওকে অন্যরকম লাগছে।”
ঠিক কথা। আমি পাল্টে গেছি।
“তুমি কি মনে করো প্রেম ভ্রম?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“কেন এই প্রশ্ন?”
“কারণ আগে মনে হতো জিনিয়া ছাড়া বাঁচব না। এখন দেখি স্বাভাবিক।”
হ্যাপি ভাবল। তারপর বলল, “তখন যা অনুভব করেছিলে, সেটা মিথ্যা ছিল?”
“না। সত্যি ছিল।”
“তাহলে ভ্রম কীসের?”
ভালো প্রশ্ন।
রাতে শুয়ে ভাবলাম। তখন সত্যি ছিল। এখন অন্যরকম।
দুটোই কি সত্যি?
মনে পড়ল বাবুর কথা। বিয়ের তিন বছর পর বলেছিল, “প্রেমের সময় মনে হতো এ ছাড়া বাঁচব না। এখন মনে হয় এর সাথেই সারাজীবন!”
হেসেছিলাম তখন। এখন হাসি আসে না।
সুলতানের কথা মনে পড়ল। পাঁচ বছর ধরে এক মেয়েকে ভালোবাসে। মেয়ে তাকে ভালোবাসে না।
জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কেন এত কষ্ট?”
“ভালোবাসতে তো ওর অনুমতি লাগে না। আমার ভালোলাগা। আমি দেব।”
সে ভ্রমে নাকি সত্যে?
জানি না।
পরদিন সকালে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, তুমি কি মাকে ভালোবাসো?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে জানো?”
কীভাবে জানি? ভালো প্রশ্ন।
“জানি না। জানি যে ভালোবাসি।”
“আর আগে? তুমি কি অন্য কাউকে ভালোবেসেছ?”
হ্যাপি তাকাল আমার দিকে। অপেক্ষা করছে উত্তরের।
“হ্যাঁ। একজনকে।”
“তাহলে তুমি দুজনকে ভালোবাসো?”
“না। একজনকে ভালোবাসতাম। এখন অন্যজনকে ভালোবাসি।”
আরাশ ভাবল। “তাহলে ভালোবাসা পাল্টায়?”
“হ্যাঁ। পাল্টায়।”
আরাশ চলে গেল। হ্যাপি বলল, “সত্যি বলেছ।”
“কী?”
“যে ভালোবাসা পাল্টায়।”
“তুমি কি মনে করো এটা খারাপ?”
“না। মনে করি স্বাভাবিক।”
সন্ধ্যায় সাইফুলের সাথে দেখা। কফি খেতে বসলাম।
“তুই কেমন আছিস?” সাইফুল জিজ্ঞেস করল।
“ভালো। তুই?”
“ভালো। তবে একটা কথা বলব?”
“বল।”
“আমার মনে হয় আমি আমার বউকে ভালোবাসি না।”
থামলাম। কী বলব?
“কেন মনে হয়?”
“কারণ প্রেম করার সময় যা লাগত, সেটা এখন লাগে না। হৃদস্পন্দন বাড়ে না। ঘুম হয় না—এসব আর হয় না।”
“তাহলে কী হয়?”
“তাহলে… শান্তি হয়। নির্ভরতা হয়। অভ্যাস হয়।”
“এটা কি ভালোবাসা না?”
সাইফুল চুপ করে রইল। তারপর বলল, “জানি না ভাই। তুই বল।”
আমিও জানি না। কী বলব?
“আমি মনে করি এটাও ভালোবাসা। অন্যরকম। কিন্তু ভালোবাসা।”
“তুই নিশ্চিত?”
“না। কিন্তু মনে হয়।”
সাইফুল হাসল। “আমরা কেউ নিশ্চিত না।”
ঠিক কথা। কেউ নিশ্চিত না।
রাতে হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে জানো?”
“জানি। ব্যাখ্যা করতে পারব না। কিন্তু জানি।”
“আমি তো তোমাকে ফুল দিই না। কবিতা লিখি না। এসব করি না।”
হ্যাপি হাসল। “তুমি রাতে আমার জন্য জল রেখে যাও। সকালে চা বানাও। আরাশ অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকো। এগুলো কি ভালোবাসা না?”
চুপ করে রইলাম।
“জিনিয়ার জন্য কবিতা লিখেছিলাম,” আমি বললাম। “তোমার জন্য লিখি না।”
“কারণ?”
“জানি না।”
“আমি জানি,” হ্যাপি বলল। “কারণ জিনিয়ার জন্য লেখা ছিল স্বপ্ন। আমার জন্য করা হচ্ছে জীবন।”
স্বপ্ন। জীবন।
দুটোই কি ভালোবাসা?
হয়তো। হয়তো না।
জানি না।
শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করলাম।
জিনিয়ার মুখ মনে পড়ল। আঠারো বছর বয়সে। হাসছে। চুল উড়ছে।
সেই মুহূর্তে সত্যি মনে হয়েছিল এর চেয়ে সুন্দর কেউ নেই।
এখন? জানি না সুন্দর কি না।
কিন্তু তখন সত্যি ছিল।
হ্যাপির মুখ মনে পড়ল। গতকাল সকালে। চা বানাচ্ছিল। চুল এলোমেলো। কোনো মেকাপ নেই।
সুন্দর লাগেনি। কিন্তু ভালো লেগেছে।
দুটো কি একই?
জানি না।
হয়তো জিনিয়া ছিল আগুন। জ্বলজ্বলে। হঠাৎ। দ্রুত।
হয়তো হ্যাপি নদী। শান্ত. ধীর। কিন্তু থেমে নেই।
হয়তো দুটোই ভালোবাসা। হয়তো একটা ভ্রম।
জানি না।
ঘুম এল। চোখ বন্ধ হয়ে এল।
স্বপ্নে দেখলাম জিনিয়া। হাসছে। হাত বাড়িয়ে আছে।
কিন্তু আমি যাচ্ছি না। দাঁড়িয়ে আছি।
চোখ খুলল। সকাল হয়েছে।
হ্যাপি চা দিল। “কী দেখছিলে স্বপ্নে?”
“কিছু না।”
“মিথ্যা বলছ।”
“হ্যাঁ। মিথ্যা বলছি।”
“বলো।”
“জিনিয়াকে দেখেছিলাম।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। চা খেল। তারপর বলল, “তুমি কি তাকে মিস করো?”
“না।”
“সত্যি?”
“সত্যি। সেই সময়টা মিস করি। সেই ছেলেটাকে মিস করি যে কবিতা লিখত।”
“সেই ছেলে কোথায়?”
“গেছে। এই মানুষ এসেছে যে চা বানায়।”
হ্যাপি হাসল। “আমার এই মানুষটাই ভালো লাগে।”
আরাশ এল। “আব্বু, স্কুল দেরি হয়ে যাবে।”
“চল।”
যাওয়ার সময় হ্যাপি বলল, “তুমি জানো তো?”
“কী?”
“যে আমি… মানে…”
“জানি,” আমি বললাম। “তুমি বলো না। কিন্তু আমি জানি।”
হ্যাপি হাসল।
রাস্তায় আরাশ বলল, “আব্বু, ভালোবাসা কী?”
“জানি না আরাশ।”
“তুমি তো মাকে ভালোবাসো। তাহলে জানো না কেন?”
“কারণ ভালোবাসা বোঝা যায়। বলা যায় না।”
“তাহলে আমি কীভাবে বুঝব আমি কাউকে ভালোবাসি?”
“বুঝে যাবে। সময় হলে।”
আরাশ চুপ করে রইল।
স্কুলে নামিয়ে দিলাম। ফিরে আসছি।
মনে পড়ল জিনিয়ার কথা। দশ বছর আগে শেষবার দেখেছিলাম। কেঁদেছিলাম সারারাত।
ভেবেছিলাম আর কখনো কাউকে ভালোবাসতে পারব না।
কিন্তু পেরেছি। হ্যাপিকে।
অন্যরকম। কিন্তু ভালোবেসেছি।
তাহলে জিনিয়ার জন্য যা ছিল, সেটা কী ছিল?
ভ্রম? না।
সত্যি? হ্যাঁ।
কিন্তু সেই সত্যি এখন আর নেই।
নতুন সত্যি এসেছে।
হয়তো ভালোবাসা এভাবেই কাজ করে। পাল্টায়। বদলায়। নতুন হয়।
হয়তো না।
জানি না।
বাসায় ফিরে এলাম। হ্যাপি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
“কী ভাবছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“তোমার কথা।”
“কী ভাবছ?”
“ভাবছি তুমি কেমন ছিলে আঠারো বছর বয়সে।”
“পাগল ছিলাম।”
“এখন?”
“এখন শান্ত।”
“ভালো লাগে?”
“জানি না। তুমি কোনটা পছন্দ করো?”
হ্যাপি ভাবল। তারপর বলল, “এখনকার তোমাকে। কারণ এই তুমি আছ। ওই তুমি ছিল।”
ঠিক কথা। ওই আমি ছিল। এই আমি আছি।
হয়তো জিনিয়া ছিল সেই আমির ভালোবাসা। হ্যাপি আছে এই আমির ভালোবাসা।
হয়তো দুটোই সত্যি। দুটোই ভ্রম।
হয়তো দুটোই ভালোবাসা।
জানি না।
কিন্তু জানি এখন হ্যাপি আছে। এটুকু জানি।
এটুকুই হয়তো যথেষ্ট।
হয়তো না।
জানি না।
একটু ভাবনা রেখে যান