
ভুলতে না পারা ক্ষমতা না।
আমার এক আত্মীয় সব মনে রাখেন। ১৯৮২ সালে কে কী বলেছিল। ১৯৯৫ সালে কে অপমান করেছিল। কুড়ি বছর আগের প্রতিটা ব্যথা। ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছেন। স্মৃতির ভারে।
স্মৃতি হলো ক্ষত। যে ক্ষত সারে না। বারবার খুলে যায়। বারবার রক্ত ঝরে।
মনে রাখা মানে সম্মান না। মনে রাখা মানে শাস্তি। তুমি মনে রাখো — মানে তুমি আটকে আছো। অতীতে। যা ছিল তাতে। এবং অতীতে আটকে মানে জীবন থেমে যাওয়া।
মা ভুলে যেতেন। কে কী বলেছিল মনে থাকত না। বাবা বিরক্ত হতেন। কিন্তু মা জানতেন — ভুলে যাওয়াই মুক্তি। মা মরার পরে বোঝা গেল। সেটাই ছিল মায়ের শক্তি।
মানুষ ভাবে মনে রাখা মানে ভালোবাসা। মিথ্যা। ভালোবাসা মানে এখন। এই মুহূর্তে। অতীত না।
স্মৃতি মানে পুনরাবৃত্তি। তুমি মনে করো — মানে তুমি আবার বাঁচো সেই মুহূর্ত। আবার অনুভব করো সেই ব্যথা। আবার মরো। এভাবে তুমি বারবার মরতে থাকো।
তুমি বয়স্ক কেন হও? শরীর বুড়ো হয় বলে? না। তুমি বয়স্ক হও কারণ তোমার স্মৃতি ভারী। ষাট বছরের হাজার ব্যথা। সব মনে রাখো। সেই ভারে তুমি বুড়ো।
শিশু কেন হালকা? কারণ তার স্মৃতি নেই। কাল কী হয়েছিল মনে নেই। তাই সে দৌড়াতে পারে। এক ঘণ্টা আগে কাঁদছিল — এখন হাসছে। ছেড়ে দিয়েছে।
আমরা? আমরা দশ বছর আগের ব্যথা বুকে নিয়ে বাঁচি। এটাই পাগলামি।
কেন আঁকড়ে ধরি? কারণ ব্যথা হলো পরিচয়। সব ছেড়ে দিলে মানুষ ভাবে — আমি কে? শূন্য। এবং সেই শূন্যতাই ভয়ের। কিন্তু সত্য হলো — স্মৃতি আঁকড়ে মানুষ ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে।
ভুলে যাওয়া হয় না। হয়ে যায়। যখন তুমি আর ধরে রাখো না।
ভুলে যাওয়া আর ছেড়ে দেওয়া এক না। ভুলে যাওয়া মানে মুছে ফেলা। ছেড়ে দেওয়া মানে — স্মৃতি আসবে, দেখবে, তারপর যেতে দেবে। আটকাবে না।
অতীত নেই। তবু মানুষ সেখানে বাঁচে। যে জায়গা নেই সেখানে বাঁচে। আর বর্তমান? বর্তমান চলে যায়। দেখা হয় না।
বর্তমান হলো জীবন। অতীত মৃত। ভবিষ্যত অস্তিত্বহীন।
চা গরম। আলো আসছে। এই মুহূর্ত।
এটাই যথেষ্ট।
স্মৃতি আসবে। আসুক। দেখবে। তারপর যেতে দেবে। কারণ আটকালেই আটকা পড়া। ছেড়ে দিলেই মুক্তি।
মা জানতেন। তাই মা হালকা ছিলেন। কাকা জানেন না। তাই কাকা ভারী। মনে করতে করতে মরেন।
ছেড়ে দেওয়া সহজ না। কিন্তু করতে হবে। কারণ আটকে থাকা মানে মরে যাওয়া। ছেড়ে দেওয়া মানে বাঁচা।

একটু ভাবনা রেখে যান