ব্লগ

বিবেকের নিলাম

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

নিলামঘর: মানুষের হৃদয়
নিলামকারী: জীবনের পরিস্থিতি
ক্রেতা: আমি


লট নং ১: শৈশবের সততা

নিলামকারী: “৮ বছর বয়সের একটি ছেলের সততা। দোকান থেকে ভুলে ১০ টাকা বেশি ফেরত দিলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার গুণ। কে কিনবেন?”

আমি: “আমি!”

মূল্য: মা-বাবার গর্ব।

বিক্রিত।


লট নং ২: কৈশোরের নীতি

নিলামকারী: “পরীক্ষায় নকল না করার অভ্যাস। পাশের বন্ধু উত্তর দিলেও না দেখার শক্তি। কেউ আছেন?”

আমি: “আমি নেব।”

মূল্য: গণিতে ৩৫ নম্বর (পাশ করতে পারিনি)।

বিক্রিত।


লট নং ৩: যুবকের আদর্শ

নিলামকারী: “চাকরির ইন্টারভিউতে মিথ্যা সার্টিফিকেট না দেওয়ার গুণ। কে চান?”

আমি: “আমি!”

মূল্য: স্বপ্নের চাকরি হারানো।

বিক্রিত।


লট নং ৪: নবদম্পতির বিশ্বস্ততা

নিলামকারী: “স্ত্রীর কাছে সব সত্য বলার অভ্যাস। এমনকি যেগুলো তার কষ্ট দেবে। নিচ্ছেন কেউ?”

আমি: (দ্বিধায়) “আমি…”

মূল্য: কয়েকটি রাতের ঝগড়া + একসপ্তাহ নীরবতা।

বিক্রিত।


লট নং ৫: কর্মজীবনের সততা

নিলামকারী: “অফিসে ভুয়া বিল না জমা দেওয়ার নীতি। বিশ হাজার টাকার প্রলোভন এড়ানোর ক্ষমতা। কে নেবেন?”

আমি: “আমি নেব।”

মূল্য: ২০,০০০ টাকা + সহকর্মীদের ‘বোকা’ তকমা।

বিক্রিত।


লট নং ৬: পিতৃত্বের নৈতিকতা

নিলামকারী: “সন্তানের স্কুলে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে নম্বর না বাড়ানোর নীতি। প্রাকৃতিক ফলাফল মেনে নেওয়ার সাহস। কেউ?”

আমি: (গলা শুকিয়ে) “আমি…”

মূল্য: আরাশের কান্না + তার বন্ধুদের এগিয়ে যাওয়া।

বিক্রিত।


লট নং ৭: মধ্যবয়সের টেস্ট

নিলামকারী: “এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়ার শক্তি। পরিবারের অভাব থাকা সত্ত্বেও। দরদাতা?”

আমি: (দীর্ঘ নীরবতা)

অন্য কেউ: “আমি ১ লক্ষ ২০ হাজার দিচ্ছি।”

আমি: “আমি ১ লক্ষ ৫০ হাজার!”

অন্যজন: “২ লক্ষ!”

আমি: (থেমে যাই)

বিক্রিত – অন্যের কাছে।


নিলামের শেষে হিসাব:

আমার কেনা সততার লট: ৬টি
মোট খরচ:

আমার হারানো সুযোগ: ১টি (মিথ্যা সাক্ষ্য)
সেখানে লাভ হতো:


নিলামের পর নিলামকারীর কথা:

“মহাশয়, আপনি ৬টি লট কিনেছেন। কিন্তু দেখুন – যে মানুষটি সেই শেষ লটটি কিনল, সে এখন বড় ব্যবসায়ী। তার ছেলে ভালো স্কুলে পড়ে। স্ত্রী খুশি।”

আমি: “তাহলে আমি ভুল করেছি?”

নিলামকারী: “সেটা আপনাকে বলতে হবে। তবে জেনে রাখুন – বিবেক আবার বিক্রি করা যায় না।”


সেই রাতে আয়নার সামনে:

আমি আমার ৬টি লট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

দরিদ্র কিন্তু সৎ। একা কিন্তু স্বচ্ছ। পিছিয়ে কিন্তু পরিচ্ছন্ন।

প্রশ্ন: এই দাম কি যথার্থ ছিল?

উত্তর: জানি না। তবে এই আয়নায় যে মুখটা দেখছি, সেটা কমপক্ষে আমার।

অন্যজন হয়তো আরো সুন্দর আয়না কিনতে পেরেছে।

কিন্তু তার মুখটা কি তার নিজের?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *