আজ সকালে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। হঠাত করেই।
আমি লেখার মাঝখানে ছিলাম। একটা তথ্য খোঁজার জন্য গুগলে গেলাম। দেখি কোনো পাতাই খুলছে না।
প্রথমে ভাবলাম ফোনের সমস্যা। ওয়াইফাই বন্ধ-চালু করলাম। কাজ হলো না। রাউটার বন্ধ-চালু করলাম। তবুও না।
তখন বুঝলাম – সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
এই মুহূর্তে যে অনুভূতি হলো, সেটা বর্ণনা করা কঠিন। মনে হলো আমি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি।
কাজ করতে পারছি না। তথ্য খুঁজতে পারছি না। কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। যেন হাত-পা বাঁধা অবস্থা।
হ্যাপি বলল, “এত ঘাবড়ানোর কী আছে? আগে তো ইন্টারনেট ছিল না।”
কিন্তু আগের কথা আলাদা। তখন আমরা ইন্টারনেট ছাড়া জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম। এখন আমাদের পুরো জীবন ইন্টারনেট নির্ভর।
আমার কাজ ইন্টারনেট ছাড়া সম্ভব নয়। ব্যাংকিং, কেনাকাটা, যোগাযোগ – সবকিছু অনলাইনে।
ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে আমার জীবনের একটা বড় অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
আরাশ স্কুল থেকে এসে বলল, “বাবা, আমার ক্লাসের কাজ করতে পারছি না।”
তার পড়াশোনাও এখন ইন্টারনেট নির্ভর। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল বই, গবেষণার কাজ।
আমি ভাবলাম – আমরা কখন এতটা নির্ভরশীল হয়ে গেলাম?
একটা সময় ছিল যখন আমরা বই পড়ে তথ্য সংগ্রহ করতাম। এখন গুগল ছাড়া একটা সাধারণ প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারি না।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কয়েক ঘন্টায় আমি বুঝলাম আমাদের কত দুর্বলতা।
আমরা ভেবেছিলাম প্রযুক্তি আমাদের শক্তিশালী করেছে। কিন্তু আসলে আমাদের আরও নির্ভরশীল করেছে।
একটা তার কেটে গেলে আমাদের পুরো জীবন স্থবির হয়ে যায়।
আমি চেষ্টা করলাম বই পড়ে কাজ করতে। কিন্তু অভ্যাস নেই। মনোযোগ বসছে না। বারবার ফোনে তাকাচ্ছি।
মনে হচ্ছে কোনো অঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে।
বিকেলে সংযোগ ফিরে এলো। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যেন আবার বেঁচে গেলাম।
কিন্তু এই ঘটনা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমি কি মানুষ, নাকি মানুষের খোলসে একটা যন্ত্র?
ইন্টারনেট ছাড়া আমার কী পরিচয়? আমি কী করতে পারি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখলাম – খুব কমই পারি।
আমাদের দাদা-নানারা ইন্টারনেট ছাড়াই পুরো জীবন কাটিয়েছেন। তারা কম সুখী ছিলেন না।
কিন্তু আমরা এক দিনও ইন্টারনেট ছাড়া থাকতে পারি না।
এটা কি উন্নতি, নাকি অবনতি?
আমি আরাশকে বলেছি – সপ্তাহে একদিন ইন্টারনেট বন্ধ রেখে কাটাতে। বই পড়ে, খেলাধুলা করে, প্রকৃতি দেখে।
যাতে সে বুঝতে পারে – ইন্টারনেট জীবনের অংশ, জীবন নয়।
আমাদের ইন্টারনেটের দাস হলে চলবে না। আমাদের ইন্টারনেটকে দাস বানাতে হবে।
কারণ যেদিন আমরা সংযোগ ছাড়া অসহায় হয়ে পড়ি, সেদিন আমরা আর স্বাধীন মানুষ থাকি না।
থাকি যন্ত্রের গোলাম।
একটু ভাবনা রেখে যান